বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নেতৃত্বে আছেন তারেক রহমান। এই ফল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়— এটি একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের শুরু।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো প্রতিবেশী সম্পর্ক, বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। ইতিহাস বলছে, দুই দেশের সম্পর্ক কখনও উষ্ণ, কখনও সংশয়াচ্ছন্ন। অতীতে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে আস্থার ওঠানামাও হয়েছে। তাই নতুন বিএনপি সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ— সম্পর্ককে ব্যক্তিনির্ভর বা দলনির্ভর না রেখে রাষ্ট্রনির্ভর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।
বাস্তবতা হচ্ছে, দুই দেশ একে অপরকে এড়িয়ে চলার অবস্থায় নেই। সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য, যোগাযোগ— সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগে বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, আবার বাংলাদেশের রপ্তানি ও আঞ্চলিক বাজার সম্প্রসারণেও ভারতের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। ফলে সম্পর্ক ভালো না হলে ক্ষতি দুই পক্ষেরই, আর ভালো হলে লাভও দুই পক্ষেরই।
এখানেই নতুন সরকারের নীতি নির্ধারণের পরীক্ষা। আবেগের কূটনীতি সহজ, কিন্তু টেকসই নয়। যদি সম্পর্ককে অতীতের বিরোধ বা রাজনৈতিক স্মৃতির ভিত্তিতে চালানো হয়, তবে অচলাবস্থা তৈরি হবে। বরং বাস্তববাদী পথ হবে— মতভেদ থাকলেও সহযোগিতাও চলবে। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে, আবার বাণিজ্যও বাড়বে; জলবণ্টন নিয়ে বিতর্ক থাকবে, কিন্তু যোগাযোগও চালু থাকবে। পরিণত রাষ্ট্রগুলো এভাবেই সম্পর্ক চালায়।
একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ— অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যেন পররাষ্ট্রনীতিকে খুব প্রভাবিত না করে। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু সরকার যদি কূটনৈতিক অবস্থানকে অভ্যন্তরীণ জোট রাজনীতির হাতিয়ার বানায়, তবে আন্তর্জাতিক আস্থা কমবে। প্রতিবেশীরা সবসময় সরকারের স্থায়িত্বের চেয়ে নীতির ধারাবাহিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
অর্থনীতি এখানে বড় সুযোগ এনে দিতে পারে। বিগত কিছু সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ শিল্প, জ্বালানি, পরিবহন ও সীমান্তবাজার— এই চারটি ক্ষেত্রেই দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব। সহজ বাণিজ্য, কম শুল্ক জটিলতা এবং স্থিতিশীল নীতি বিনিয়োগ বাড়াবে। জনগণও বুঝবে— পররাষ্ট্রনীতি কেবল কূটনীতিকদের বিষয় নয়, তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও জড়িত।
তবে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য শুধু চুক্তি নয়, আস্থা দরকার। গত এক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস, আশ্রয়প্রাপ্ত নেতাদের প্রশ্ন বা জনমতের আবেগ— এসব বিষয় সংবেদনশীল। তাই হঠাৎ নাটকীয় পরিবর্তনের বদলে ধীরে ধীরে আস্থা গড়ে তোলাই কার্যকর। উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক, নিয়মিত সংলাপ ও ছোট ছোট বাস্তব সহযোগিতা— এই পথই স্থায়ী সমাধান দেয়।
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও সরকারের কাজ কম নয়। গণভোটে প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়ন, ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা— এসব বিষয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলবে। কারণ স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রই বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেশী হয়। পররাষ্ট্রনীতি শেষ পর্যন্ত দেশের ভেতরের রাজনীতির প্রতিফলন।
সব মিলিয়ে এই নির্বাচন কেবল নতুন সরকার নয়, নতুন সুযোগও তৈরি করেছে। যদি নতুন নেতৃত্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে সহযোগিতা, আবেগের বদলে বাস্তবতা এবং অতীতের বদলে ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দেয়, তবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও নতুন ভারসাম্যে পৌঁছতে পারে। এই মুহূর্তে দুই দেশেরই দরকার সংযম, ধৈর্য ও বাস্তববোধ— কারণ ভৌগোলিকভাবে প্রতিবেশী বদলানো যায় না, কিন্তু তার চরিত্র অবশ্যই বদলানো যায়।