রাজ্যে শিল্পের নতুন সম্ভাবনা

Image: IANS

পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও অর্থনীতির জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে চলেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সম্প্রতি রাজ্যে ৩,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। প্রকল্পগুলির মধ্যে তিনটি গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (জিআরএসই)-এর এবং দুটি যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেডের। প্রতিরক্ষা উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের প্রসারে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রকল্পগুলির সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হল, এগুলি শুধু কয়েকটি নতুন কারখানা বা উৎপাদন কেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাজ্যের শিল্প পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ। ফলে এর সুফল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ— দুইভাবেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।

জিআরএসই কলকাতা ও হাওড়া অঞ্চলে দুটি ছোট শিপইয়ার্ড এবং রায়চকে হুগলি নদীর তীরে ৩২ একর জমিতে একটি নতুন সুবিধা গড়ে তুলবে। এর ফলে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের ক্ষমতা বাড়বে। রায়চকের নতুন কেন্দ্রটি ২০০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ যুদ্ধজাহাজ পরিচালনা করতে পারবে। এর ফলে ভবিষ্যতে আরও বড় ও আধুনিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের প্রতিযোগিতায় জিআরএসই অংশ নিতে পারবে।

এই উদ্যোগের সঙ্গে স্থানীয় শিল্পেরও বড় সুযোগ তৈরি হবে। একটি বড় শিপইয়ার্ডকে ঘিরে বহু ধরনের সহযোগী শিল্প গড়ে ওঠে। যন্ত্রাংশ, ইস্পাত, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহণসহ নানা ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি সংস্থার কাজের সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ একটি বড় প্রকল্পের প্রভাব তার নিজস্ব সীমানার মধ্যে আটকে থাকে না; তা একটি বৃহত্তর শিল্প-পরিবেশ তৈরি করতে পারে।


জিআরএসই ইতিমধ্যেই ভারতের আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ৮০০-র বেশি জাহাজ নির্মাণের অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। আগামী দিনে নতুন প্রজন্মের অফশোর পেট্রোল ভেসেলে ৮০ শতাংশের বেশি দেশীয় উপাদান ব্যবহারের লক্ষ্যও আত্মনির্ভর ভারতের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করবে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, দেশের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে ইছাপুরের মেটাল অ্যান্ড স্টিল ফ্যাক্টরির আধুনিকীকরণও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেড ইতিমধ্যে সেখানে ৭৫০ কোটির বেশি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ১৯৭৮ সালের পুরনো প্রযুক্তির পরিবর্তে ইন্ডাস্ট্রি ৪.০-উপযোগী আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। ভারী কামান, নৌ-অস্ত্র এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ধাতু উৎপাদনে এই আধুনিকীকরণ বড় ভূমিকা নিতে পারে।

এই প্রকল্পগুলির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল কর্মসংস্থান। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পাঁচটি প্রকল্পে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। প্রত্যক্ষ চাকরির পাশাপাশি পরিবহণ, পরিষেবা, নির্মাণ, সরবরাহ এবং আনুষঙ্গিক শিল্পে বহু নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলার তরুণদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের সামনে এখন আন্তর্জাতিক জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বড় ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের কয়েকটি ঐতিহ্যশালী জাহাজ নির্মাণকারী দেশে উৎপাদনক্ষমতা কমছে, অথচ নৌ ও বাণিজ্যিক জাহাজের চাহিদা বাড়ছে। ভারত যদি আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তবে বিশ্ব জাহাজ নির্মাণের মানচিত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেওয়া সম্ভব।

একই সঙ্গে মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহল বা এমআরও ক্ষেত্রেও ভারতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি শক্তিশালী এমআরও কেন্দ্র গড়ে উঠলে বিদেশে মেরামতের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।

পশ্চিমবঙ্গের শিল্প-ইতিহাসে উত্থান-পতন দুটোই আছে। কিন্তু অতীতের সীমাবদ্ধতা নিয়ে পড়ে না থেকে নতুন প্রযুক্তি, নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন শিল্পসংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাওয়াই এখন প্রয়োজন। ৩,৫০০ কোটি টাকার এই পাঁচটি প্রকল্প সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে।

তবে প্রকল্পের ঘোষণা যেন কোনও কারণে আটকে না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং স্থানীয় শিল্পকে যুক্ত করার উপর জোর দিতে হবে। সরকার, শিল্প সংস্থা ও স্থানীয় উদ্যোগপতিদের মধ্যে সমন্বয় যত বাড়বে, এই বিনিয়োগের সুফলও তত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছবে।

বাংলার শিল্পায়নের নতুন অধ্যায় লেখার জন্য তাই এই প্রকল্পগুলিকে ইতিবাচক সূচনা হিসেবেই দেখা উচিত। প্রতিরক্ষা উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ ও আধুনিক প্রকৌশলের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ আবার দেশের শিল্পমানচিত্রে আরও উজ্জ্বল জায়গা করে নিতে পারে। প্রয়োজন শুধু ধারাবাহিকতা, দক্ষতা এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে চলার মানসিকতা।