গৌতম মণ্ডল
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সাম্প্রতিক ইতিহাসে কেবলমাত্র একটি নির্বাচন ছিল না; বরং এটি ছিল ধ্বংসের কিনারায় চলে যাওয়া একটি রাষ্ট্রের গতিমুখ নির্ণয়ের অগ্নিপরীক্ষা। নির্বাচনের ফলাফল ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না, বরং আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি কিছুটা স্পষ্ট হতে পারে। ইউনূস-পরিচালিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের
মব-মওদুদীবাদী দুঃশাসনে বাংলাদেশ প্রায় এক নরকে পরিণত হয়। কয়েক হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস, দীপু দাস-সহ বহু মানুষকে অর্ধজীবন্ত পুড়িয়ে মারা এবং মাজার, মন্দির ও বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ও স্থাপনা ভাঙচুর, মুক্তিযোদ্ধা ও সংখ্যালঘুদের নিগ্রহ, হত্যা এবং বিনাবিচারে কারাগারে নিক্ষেপ করা ছিল তাঁর শাসনামলের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি মুহুর্মুহু পাল্টাতে শুরু করে। দীর্ঘ প্রায় আঠারো বছর দেশের বাইরে থাকায় পর বাংলাদেশে ফিরে আসেন জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। এসেই তিনি সংযত আচরণ ও সমাজের প্রায় সমস্ত স্তরের মানুষের সঙ্গে সংলাপ শুরু করেন। বিএনপি যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকেই সবার আগে স্থান দেয়, তা প্রায় প্রতিটি সভায় তিনি জানান দেন। অপরপক্ষে একটা সময় মনে হচ্ছিল তৌহিদী জনতা যে-কোনও সময়ে জোর করে বিপ্লবী সরকার গঠন করবে। কিন্তু সেনাবাহিনী এবং বৈশ্বিক শক্তির চাপে ইউনূস নির্বাচন ঘোষণা করতে বাধ্য হন। সেখানেও জামায়াত-এনসিপি-সহ ১১টি দলকে দিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একটা ইঞ্জিনিয়ারিং-ও তৈরি করেন তিনি। কিন্তু ভোটটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশের জনগণের প্রতিরোধের মুখে ধূলিসাৎ হয়ে যায় জামায়াত জোটের সমস্ত হিসেব। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষেরা তো বটেই, সচেতন নারীরাও প্রমাদ গুণছিলেন। তাঁদের অনেকেরই ধারণা হয়, জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশ আর বাংলাদেশ থাকবে না, হয়ে যাবে একটি কট্টর ইসলামিক রাষ্ট্র। ’৭২-এর সংবিধানকে বর্জন করে নারীস্বাধীনতা হরণ করা হবে। দেশে চালু হতে পারে শরীয়া আইনও। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় অপশক্তিকে রুখতে ভেতরে-ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সমস্ত মানুষ এককাট্টা হয়।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৬০% ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। বিএনপি এককভাবে ২০৯টি এবং জোটবদ্ধ হয়ে ২১৩টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। জামায়াত–এনসিপি-সহ ১১টি দলের জোট পায় প্রায় ৭৮টি আসন। স্বতন্ত্র দলের প্রার্থীরাও পেয়েছেন কয়েকটি আসন। অবশ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ফলাফল তথা নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই ‘প্রহসন’ বলে প্রত্যাখান করেছেন। বিগত ১৮ মাসে যখন মুক্তিযুদ্ধ বা জয় বাংলা উচ্চারণ করাটাই যখন ছিল গর্হিত অপরাধ সেখানে বাংলাদেশের বিএনপি রাজনীতিবিদ ফজলুর রহমান এবং ব্যারিস্টার রুমিনা ফারহানা নিরবচ্ছিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সওয়াল করে গিয়েছেন। রুমিনা ফারহানাকে বিএনপি টিকিট দেয়নি কিন্তু তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটে দাঁড়িয়ে জয়লাভ করেছেন৷ অপরপক্ষে বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন ৮০ ছুঁই-ছুঁই মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। এই দুটি ঘটনা এবারের ভোটের অন্যতম ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। যদিও এবারের ভোটে জয়ী নারী ও সংখ্যালঘু প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে নগণ্য। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনে
৭ জন নারী ও ৪ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ইউনূসের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন একটি গণভোটেরও আয়োজন করে। এই গণভোটের উদ্দেশ্য ছিল ৭২-এর সংবিধান বাতিল করে জুলাই সনদ চালু করা।
তবে, আশ্চর্যের বিষয়, বিগত ১৮ মাসে উপদেষ্টারা অনেক ধরনের প্ররোচনামূলক কথা বললেও ভারত কিন্তু পালটা কড়া তেমন কিছু প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তবে নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ফোনে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। তারেক রহমানের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধি হয়ে উপস্থিত ছিলেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে জামায়াত–এনসিপি জোটের পর্যুদস্ত হওয়া এবং বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি বাংলাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ৷ তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার শপথ, আওয়ামী লীগের কিছু কার্যালয় পুনরায় খোলা, এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি— সব মিলিয়ে দুই দেশ এক সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। আনন্দের খবর, গতকাল থেকে প্রতিবেশী দুই দেশের বিভিন্ন দূতাবাস থেকে নাগরিকদের মধ্যে ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি আবার নতুন করে চালু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য প্রধানত এক বিশেষ রাজনৈতিক বৃত্তে আবদ্ধ ছিল— এমন ধারণা জনমনে প্রবল। এখন যদি সেই আবেগ অন্য রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে আশ্রয় পায় এবং নতুন প্ল্যাটফর্ম সেই আবেগকে কাজে লাগায় তাহলে তা ইতিহাসের একরৈখিক গতিপথ ভেঙে বহুত্ববাদী জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠা করবে। নতুন সরকারের দায়িত্ব হবে মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় সম্পত্তি নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিশিষ্ট বামপন্থী তাত্ত্বিক গ্রামসি তাঁর আধিপত্য (hegemony) ধারণায় দেখিয়েছিলেন— শাসন কেবল শক্তির দ্বারা নয়, সম্মতির মাধ্যমে টিকে থাকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে দুটি অক্ষের ভিতর পরস্পরবিরোধী বয়ান কার্যকর ছিল। কিন্তু সমাজমাধ্যম ও বিকল্প সাংবাদিকতার কারণে একটি Counter-hegemonic discourse গড়ে ওঠেছে। এই প্রতিবয়ান নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।
আরও একটা কথা, বিগত ১৮ মাসে গোষ্ঠী-চালিত সহিংসতা ও মব দেখে দেখে জনগণ ক্লান্ত, কাজেই নতুন সরকারকে প্রথমেই আইনের শাসন দৃঢ় করতে হবে। Rule of law–হল এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তির খেয়াল নয়, নীতির ধারাবাহিকতা প্রাধান্য পায়। বিগত ১৮ মাসে ইউনূস পরিচালিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্বারা সবচাইতে নিগৃহীত হয়েছে সংখ্যালঘু ও নারীরা। তাই শুধুমাত্র আশ্বাস নয়, বিএনপিকে এবার প্রকৃতই এঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এই প্রসঙ্গে কবি ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিপ্লব রায় এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, ‘সার্বিকভাবে বাংলাদেশপন্থার জয় হল। ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী-সহ সকল প্রান্তিক মানুষেরা এই ফলাফল থেকে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা পেয়েছে।’ এই ফলাফলকে বাংলাদেশের নারীরা কীভাবে দেখছেন? কবি রিমঝিম আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানিয়েছেন, ‘আমরা খুবই সন্ত্রস্ত ছিলাম। কিন্তু জামায়াত পর্যুদস্ত হওয়ায় আমরা কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছি।’
এবার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক অনিবার্য। নদীজল বণ্টন, খাদ্যদ্রব্য-সহ সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। বাংলাদেশের তিনদিকেই রয়েছে ভারতের সীমানা। তাই বিএনপি চালিত বাংলাদেশ সরকার যদি বাস্তবকে স্বীকার করে সম্পর্ক উন্নয়নের পথে এগোয়, তবে তা কেবল কূটনৈতিক সাফল্য নয়; এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতারর পক্ষেও ভালো হবে। তবে সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে নিশ্চিতভাবেই সমতা ও পারস্পরিক সম্মান। বিএনপি দুই তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ঠিকই কিন্তু শতাংশের হিসাবে জামায়াতেরও কিন্তু বিপুল উত্থান হয়েছে। জামায়াত নানানভাবে প্রতিপদে সরকারকে বিপদে ফেলতে চাইবে। ফেলবেও। ৭১-এর পরাজিত এই মৌলবাদী শক্তিকে প্রতিহত করতে আওয়ামী লীগের কার্যালয় পুনরায় খোলা ও তাদের কার্যাবলীর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
তবে ইনিংসের শুরুতেই তারেক জিয়া একটা বিশাল ছক্কা হাঁকিয়েছেন। ভোটে জিতে এসেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি, দলের সাংসদ ও অন্যান্য মন্ত্রীরা কেবলমাত্র সংসদে রাষ্ট্রপতির নিকটে শপথগ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ গণভোটে গৃহীত হলেও জুলাই সনদকে তাঁরা প্রত্যাখান করেছেন। এর মাধ্যমে তারেক রহমান পরিণত রাজনৈতিকমনস্কতার পরিচয় দিয়েছেন। যেসমস্ত মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘুদের বিনাবিচারে ইউনূস সরকার কারাগারের অন্ধকারে রেখেছেন এবার তাঁদেরকে দ্রুত মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করতে এই কাজটিকে তারেক রহমানের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।