ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে লোকসভার স্পিকারের পদটি কেবল প্রশাসনিক নয়, নৈতিক এবং সাংবিধানিক গুরুত্বেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সংসদের সমস্ত সদস্যকে সমান সুযোগ দেবেন— এটাই প্রথা, এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলির যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা এই মৌলিক প্রত্যাশাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী দল ইতিমধ্যেই স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে। তাঁদের অভিযোগ, স্পিকার সংসদ পরিচালনায় নিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং বারবার শাসক দল বিজেপির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে বিরোধী নেতাদের বক্তব্য রাখার সুযোগ না দেওয়া এবং বাজেট অধিবেশনে আটজন সাংসদের সাসপেনশনের মতো সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এই ক্ষোভ তীব্র হয়েছে। বিরোধীদের মতে, সংসদে বিতর্কের অধিকার গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা, সেই অধিকার যদি সংকুচিত হয়, তবে সংসদের মর্যাদাই ক্ষুণ্ণ হয়।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন তাৎপর্য যোগ করেছে তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। এতদিন আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাবের সঙ্গে নিজেদের নাম না জুড়লেও শনিবার তৃণমূল কংগ্রেস জানিয়ে দিয়েছে, তারা স্পিকারের বিরুদ্ধে আনা বিরোধীদের প্রস্তাবকে সমর্থন করবে। দলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমোদনেই এই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। অনেকেই এটিকে বিরোধী ঐক্যকে আরও জোরদার করার কৌশল হিসেবেই দেখছেন।
প্রসঙ্গত, আগে তৃণমূলের তরফে বলা হয়েছিল, স্পিকারকে আগে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়া উচিত। দলের লোকসভা নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, অভিযোগের জবাব না মিললে তখন অনাস্থা প্রস্তাব আনা যেতে পারে। এখন সেই প্রক্রিয়াগত দ্বিধা কাটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধীদের পাশে দাঁড়াল। ফলে অনাস্থা প্রস্তাবের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়ল।
অবশ্য বাস্তবতা হল, লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে শাসক দল সহজেই এই প্রস্তাব খারিজ করে দিতে পারবে। সেই অর্থে স্পিকার পদে ওম বিড়লার অবস্থান নড়বড়ে হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু বিরোধীদের উদ্দেশ্যও মূলত সেটি নয়। তাঁদের লক্ষ্য, সংসদের রেকর্ডে স্পষ্টভাবে এই প্রতিবাদটি নথিভুক্ত করা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কখনও কখনও প্রতীকী প্রতিবাদও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক মূল্যায়নের ভিত্তি তৈরি করে।
ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে স্পিকারের নিরপেক্ষতার প্রশ্ন নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে স্পিকারদের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু সাধারণত একটি অলিখিত নিয়ম বজায় ছিল— স্পিকার একবার নির্বাচিত হলে তিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংসদের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবেন। সেই ঐতিহ্যই আজ প্রশ্নের মুখে।
সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের ক্ষেত্র নয়, এটি মতবিনিময়ের মঞ্চ। সেখানে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমিয়ে দিলে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। শাসক দলের সমালোচনা শোনা এবং তার উত্তর দেওয়ার মধ্যেই সংসদের প্রাণশক্তি নিহিত। সেই কারণেই স্পিকারের নিরপেক্ষতা শুধু একটি নৈতিক দাবি নয়, এটি সাংবিধানিক দায়িত্ব।
এই পরিস্থিতিতে স্পিকার যদি নিজে থেকেই সংসদের সব পক্ষকে সমান সুযোগ দেওয়ার ব্যাপারে আরও সতর্ক হন, তবে তা সংসদের মর্যাদা রক্ষার পক্ষে ইতিবাচক হবে। কারণ গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়ার গুরুত্ব তার চেয়ে কম নয়।
লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত পরাজিত হলেও, এই বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রেখে যাবে— সংসদের স্পিকার কেবল ক্ষমতার প্রতীক নন, তিনি গণতান্ত্রিক ন্যায়পরায়ণতারও প্রতীক। সেই মর্যাদা রক্ষা করা তাঁরই দায়িত্ব, আর সেই দাবিই আজ জোরালোভাবে তুলছে বিরোধী শিবির।