সাংবাদিক হিসেবেও নেতাজী সুভাষচন্দ্রের অবদান অতুলনীয়

ধ্রুবজ‍্যোতি মণ্ডল: দেখতে দেখতে ১২৯ বছর অতিক্রান্ত হল। ফি বছর নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন এলেই তাঁর স্মরণে প্রভাতফেরী, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা প্রভৃতি নানান অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু তিনি যে একজন দুঁদে সাংবাদিক ছিলেন তা নিয়ে চর্চা কোথায় ? বিশেষ করে দুনিয়া জুড়ে এরকম এক তুমুল মিডিয়া অভ্যুত্থানের যুগে।ভারতের স্বাধীনতার জন‍্য নেতাজীর সংগ্রাম তো সর্বজনবিদিত। তাঁর বহুমুখী প্রতিভা, ত‍্যাগ, রোমাঞ্চকর জীবনদর্শন আজও বিশ্বের বিস্ময়। কিন্তু এরই পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ সম্পাদক এবং নির্ভীক সাংবাদিকও ছিলেন। আজকে এই অস্থির সময় দাঁড়িয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে তাঁর সেদিনের সেই সাংবাদিকতা আমাদের সকলের কাছে সত‍্যিই এক শিক্ষনীয় বিষয়।

বলতে গেলে, বাংলা দৈনিক ‘বাংলার কথা’ প্রকাশিত না হলে বোধহয় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সাংবাদিকতার সঙ্গে আমাদের কোনও পরিচয়ই ঘটত না। এছাড়া দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ প্রতিষ্ঠিত ‘ ফরোয়ার্ড ‘ সংবাদপত্রেও তিনি কাজ করেছেন। বাংলা সংবাদপত্র ‘ বাংলার কথা‘নেতাজী নিজেই প্রকাশ করেছিলেন। প্রকাশকাল সম্ভত ১৯২৩ – ২৪ সাল হবে। চার পাতার এই দৈনিক তিনিই সম্পাদনা করতেন। এই কাগজ প্রকাশে তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনকে আরও জোরদার করা। মানুষের কাছে তাঁর পরিকল্পনা তাঁর উদ্দেশ্যকে পৌঁছে দেওয়া।

যতদূর জানা যায়, সেই সময় চৌরিচৌরায় হিংসাত্মক আন্দোলন হওয়ার পর মহাত্মা গান্ধী অহিংসা, অসহযোগ আন্দোলন প্রত‍্যাহার করেছিলেন। কিন্তু তখনও দেশের স্বাধীনতা অনেক দূরে। এদিকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও পন্ডিত মতিলাল নেহরু দেশকে স্বাধীন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। মহাত্মার সঙ্গে তাঁদের রীতিমতো মতবিরোধ শুরু হয়ে গেছে। দেশবন্ধু স্বরাজ‍্য পার্টি গঠন করেছেন। অথচ দেশের সংবাদপত্রগুলির থেকে তিনি তেমন সমর্থন পাচ্ছেন না। অমৃতবাজার পত্রিকা, দৈনিক বসুমতী, কাগজগুলি তখন গান্ধীজির মত ও পথের একনিষ্ঠ সমর্থক।


সুভাষচন্দ্র সেসময় বাংলা প্রাদেশিক কংগ্রেসের প্রচারের দায়িত্বে কিন্তু তাঁদের হাতে কোনও প্রচার মাধ্যম নেই। এই অবস্থা থেকেই সুভাষচন্দ্র বসু সম্পাদিত ‘ বাংলার কথা’- র জন্ম হয়েছিল। শুরু হয়েছিল তাঁর সাংবাদিক জীবন।
সেই সময় স্বাধীনতা সংগ্রামীরা দেশ জুড়ে আরও অনেক কাগজ প্রকাশ করতেন। রঙ্গস্বামী আয়েঙ্গার চালাতেন ‘ স্বদেশ মিত্রম ‘ নামে একটি তামিল সংবাদপত্র। কেলকারের মারাঠি খবরের কাগজ ‘ লোকমান‍্য ‘ এবং বালগঙ্গাধর তিলকের ‘ কেশরী ‘। ওঁরা সবাই সুভাষচন্দ্রের বিপ্লবী বাংলা কংগ্রেসের মুখপত্র ‘ বাংলার কথা ‘ কে সমর্থন জানিয়ে ছিলেন।

আবার দেশবন্ধু যখন ‘ফরওয়ার্ড ‘ কাগজ বার করেন তখন সেখানেও সুভাষচন্দ্র নিয়মিত লিখতেন। এই কাগজটি জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রগুলির মধ‍্যে শীর্ষে গিয়েছিল। উল্লেখ্য, সুভাষ ‘ফরওর্য়াড’ পরিচালনার দায়িত্বও পেয়েছিলেন। এবং এখানে তাঁর লেখা প্রতিবেদনগুলি দেশের মানুষকে দারুণ ভাবে প্রভাবিত করেছিল। শুধু তাই নয়, সুভাষের সংবাদ সংগ্রহ ও বন্টন ব‍্যবস্থা ছিল অত‍্যন্ত অভিনব এবং আধুনিক। পরাধীন ভারতে ইংরেজ আমলাতন্ত্রের বজ্র আঁটুনির মধ‍্যেও সুকৌশলে তিনি সরকারের গোপন তথ‍্য সংগ্রহ করে তা প্রকাশ করতেন। এর ফলে ‘ ফরওয়ার্ড ‘ সে সময় সমগ্র ভারতের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছিল।

সে যুগে দুটি বিপ্লবী দল ‘ অনুশীলন সমিতি ‘, আর ‘ যুগান্তর ‘ দল সুভাষকে খবর সংগ্রহের ব‍্যাপারে নানা ভাবে সাহায্য করত।ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিদেশিদের চোখে জনপ্রিয় করার জন‍্য সুভাষ সেখানকার সংবাদপত্র ও প্রগতিশীল নেতাদের সঙ্গেও নিবিড় সম্পর্ক রাখতেন। লর্ড অলিভিয়র, ল‍্যান্সবেরি, মেজর গ্রাহাম প্রমুখ ব্রিটিশ চিন্তানায়কদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত পত্র বিনিময় করতেন। রাসবিহারী বসুর সঙ্গেও সুভাষচন্দ্রের যোগ ছিল। প্রাচ‍্যের সংবাদপত্রগুলির মধ‍্যে তখন চীনের ‘ এগনেস স্মেডলি ‘ খুব জনপ্রিয় ছিল। নেতাজী চীনের জনগণকে ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল করার জন্য এই কাগজের সাহায্য নেন।

অন‍্যদিকে পরাধীন ভারতের ব‍্যথা- বেদনার কাহিনী, অত‍্যাচারের কথা তিনি আয়ারল‍্যান্ডেও পাঠিয়েছিলেন। আইরিশ নেতা ডি. ভ‍্যালেরার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। ওখানকার ‘ ইঙ্গ- প‍্যালি ‘ পত্রিকাতেও তিনি ভারতের খবরাখবর পাঠাতেন। কিন্তু এখানেই তিনি থেমে থাকেননি। ভারতের জনগনের বিরুদ্ধে বিদেশে ব্রিটিশ শাসকের কুৎসা রটনা বন্ধ করতে সুভাষচন্দ্র চীনের ‘ কুয়ো মিং টাং ‘ নিউজ এজেন্সির অনুকরনে ‘ ওরিয়েন্ট প্রেস সার্ভিস ‘ নামে একটি সংস্থা গঠন করেছিলেন।

সাংবাদিক হিসেবে সুভাষ ১৯৩৫ সালে রোঁমা রোঁলার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এবং ১৯২১ – ১৯৩৫ পযর্ন্ত গান্ধী আন্দোলনের বিস্তারিত খবর রোঁমা রোঁলাকে দেন, যা শুনে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। বলতে গেলে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশ্ববরেণ‍্যদের সুচিন্তিত অভিমত গ্রহণ এবং জাতীয় সমস‍্যার আশু সমাধানের জন্য যে প্রচার সুভাষচন্দ্র বিভিন্ন দেশি – বিদেশি কাগজের মাধ‍্যমে চালিয়েছিলেন তা তাঁর আগে তেমন ভাবে দেখা যায়নি। আজ তাঁর ১৩০ তম জন্মদিনে একজন দেশনায়ক হিসেবে এবং অবশ‍্যই একজন নির্ভীক ও আর্দশবান সাংবাদিক হিসেবে তাঁকে‌ নিয়ে নিবির অনুসন্ধান ও চর্চার প্রয়োজন আছে।