নেপাল হড়পা বান: চাই সতর্ক পর্যবেক্ষণ

Image: ANI

হিমবাহ ভেঙে নেমে আসা, হঠাৎ বন্যা, পাহাড়ি নদীর জলস্ফীতি— হিমালয় অঞ্চলে এগুলি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনও প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদ থেকে তৈরি বিপদের আশঙ্কা। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা তারই আর একটি মর্মান্তিক উদাহরণ। এমন বিপর্যয় হয়তো ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু তার আগাম খবর পাওয়া এবং বিপদসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া কি সম্ভব ছিল? অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই উত্তরটি হ্যাঁ।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে থামানো না গেলেও তার ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। আর তার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বা আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমন ব্যবস্থার সাফল্য ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে।গত বছর সুইজারল্যান্ডের ব্লাটেন গ্রামে একটি হিমবাহ ধসে পড়ে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর নেমে এসেছিল। পুরো একটি জনপদ কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কিন্তু প্রাণহানি তুলনামূলক ভাবে কম ছিল— কারণ বিপদের পূর্বাভাস পাওয়ার পর নয় দিন আগেই গ্রামবাসীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। একটি প্রাণও যদি বাঁচানো যায়, আগাম সতর্কতার গুরুত্ব সেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তেও গত বছর এমন সতর্কতার সুফল মিলেছিল। স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা নদীর জলের অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখে বিপদের সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছিলেন। পরদিন হিমবাহ-হ্রদ ফেটে বন্যা নামলেও ততক্ষণে অধিকাংশ মানুষ নিরাপদে সরে গিয়েছিলেন।এই ঘটনাগুলি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। আধুনিক প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের চোখ-কান এখনও অমূল্য। পাহাড়ে নিয়মিত নজরদারি করা মানুষই অনেক সময় প্রথম অস্বাভাবিক পরিবর্তনটি দেখতে পান। নদীর জলের রং বদলে যাওয়া, বরফের গায়ে নতুন ফাটল, হিমবাহের অস্বাভাবিক নড়াচড়া কিংবা হিমবাহ-হ্রদের জলস্তরে দ্রুত পরিবর্তন—এ ধরনের লক্ষণ বিপদের আগাম ইঙ্গিত হতে পারে।

কিন্তু শুধু মানুষের পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করে এত বড় এবং দুর্গম একটি অঞ্চলের হিমবাহগুলিকে নজরে রাখা সম্ভব নয়। পৃথিবীতে গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বাইরে প্রায় দুই লক্ষ হিমবাহ রয়েছে। প্রত্যেকটির উপর নিয়মিত নজর রাখা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। তাই এখন সময় এসেছে হিমবাহ পর্যবেক্ষণকে আরও উন্নত প্রযুক্তির আওতায় আনার।হিমবাহের উপর বসানো যেতে পারে স্মার্ট সেন্সর। সেগুলি বরফের তাপমাত্রা, নড়াচড়া, চাপ বা ফাটলের মতো পরিবর্তনের তথ্য সরাসরি উপগ্রহের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে পাঠাতে পারে।


একই সঙ্গে আরও বেশি উপগ্রহ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময় অন্তর হিমবাহের উচ্চ-রেজোলিউশনের ছবি তোলা দরকার। ইউরোপের সেন্টিনেল উপগ্রহগুলির মতো প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে, মহাকাশ থেকে নিয়মিত ছবি সংগ্রহ করে হিমবাহের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। বিপুল পরিমাণ উপগ্রহচিত্র ও সেন্সরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই খুব ছোট পরিবর্তনও শনাক্ত করতে পারে। কোন হিমবাহ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, কোন হিমবাহের নিচে জনবসতি বা গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো রয়েছে, কোথায় হিমবাহ-হ্রদ ফেটে বন্যার সম্ভাবনা বেশি— এই সব তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হতে পারে পৃথক ঝুঁকি-মানচিত্র।

বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই এই পথে এগোচ্ছে। কানাডায় হিমবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য স্মার্ট যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। চিনও হিমবাহ-হ্রদের উপর নজরদারির ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ভারতেও সিকিমের শাখো ছো হিমবাহের জন্য আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ হয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি এখন আর কল্পনার বিষয় নয়, তাকে কাজে লাগানোর বাস্তব সুযোগ আমাদের হাতে রয়েছে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বড় বিপর্যয়ের আগে হিমবাহ অনেক সময় সতর্ক সংকেত দেয়। কখনও সেই সংকেত কয়েক সপ্তাহ আগে, কখনও কয়েক মাস আগেও দেখা যেতে পারে। সমস্যা হল, আমরা সেই সংকেতগুলি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে পড়তে পারছি কি না।

তাই সব হিমবাহকে একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করার অবাস্তব চেষ্টা না করে প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে সেই কয়েকশো হিমবাহকে, যেগুলি ভেঙে পড়লে মানুষের জীবন, বসতি, রাস্তা, সেতু বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর উপর বড় আঘাত আসতে পারে। এই হিমবাহগুলির জন্য গড়ে তুলতে হবে ২৪ ঘণ্টার আধুনিক নজরদারি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা।

হিমালয়কে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। কিন্তু তার পরিবর্তনকে বুঝতে পারব, বিপদের লক্ষণ শনাক্ত করতে পারব এবং সময় থাকতে মানুষকে সরিয়ে নিতে পারব। প্রযুক্তি, উপগ্রহ, এআই এবং মানুষের অভিজ্ঞতা— এই চারটিকে একসঙ্গে কাজে লাগানোই এখন জরুরি। আর একটি বড় বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে, বিপর্যয়ের আগেই প্রস্তুত হওয়াই হতে হবে আমাদের লক্ষ্য। হিমবাহের দিকে তাই এখন থেকেই আরও সতর্ক চোখে তাকাতে হবে।