বিশ্বজুড়ে যখন যুদ্ধ, সংঘাত, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দাপট ক্রমশ বাড়ছে, তখন আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দীর্ঘদিন লড়াই করে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট আইনজ্ঞ নবী পিল্লে। রাষ্ট্রসংঘের প্রাক্তন মানবাধিকার প্রধান এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিচারক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন শুধু আইনি লড়াইয়ের ইতিহাস নয়, বরং নিপীড়িত মানুষের মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক নিরন্তর প্রয়াস। ২০২৬ সালের শান্তি নোবেল তাঁকে ব্যক্তিগত স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
নরওয়ের নোবেল কমিটি জানিয়েছে, শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। কমিটির বক্তব্যের তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শান্তি বলতে আমরা সাধারণত যুদ্ধবিরতি, অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করা কিংবা সংঘাতরত পক্ষগুলির মধ্যে সমঝোতাকে বুঝি। কিন্তু স্থায়ী শান্তির ভিত্তি যে ন্যায়বিচার, মানুষের সমান অধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার দায়বদ্ধতা, নবী পিল্লের কর্মজীবন সেই সত্যকেই প্রতিষ্ঠা করে।
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক দরিদ্র ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিবারে তাঁর জন্ম। বর্ণবৈষম্যের কঠোর বাস্তবতার মধ্যেই বড় হয়ে ওঠা। বাবা ছিলেন বাসচালক। দক্ষিণ আফ্রিকায় তখন বর্ণবৈষম্যভিত্তিক শাসনব্যবস্থা মানুষের জীবন, শিক্ষা, পেশা ও সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করত গায়ের রঙের ভিত্তিতে। শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ছিল বিপজ্জনক। এই পরিবেশেই নবী পিল্লে আইনকে পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং নিপীড়িত মানুষের অধিকার রক্ষার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৬৭ সালে তিনি নাটাল প্রদেশে আইনজীবী হিসেবে নিজের চেম্বার প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় কোনও মহিলার পক্ষে আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সহজ ছিল না। তার ওপর তিনি ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত, ফলে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বাধাও তাঁকে অতিক্রম করতে হয়েছিল। পরে তিনি দেশের হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ মহিলা বিচারপতি হন। তাঁর এই অগ্রযাত্রা ব্যক্তিগত সাফল্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবিরোধী সংগ্রামেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তবে নবী পিল্লের কাজের তাৎপর্য শুধু দক্ষিণ আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় জাতিগত হিংসায় প্রায় আট লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের বিচার করতে রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। চার বছর ওই ট্রাইব্যুনালের সভাপতিও ছিলেন। গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার যে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের অপরিহার্য অঙ্গ, তা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিচারব্যবস্থার বৃহত্তর তাৎপর্য হল, কোনও রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে সংঘটিত অপরাধ বলেই মানবতার বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধের দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা সামরিক কর্তৃত্ব অপরাধের বৈধতা দিতে পারে না। নবী পিল্লের মতো বিচারকদের কাজ আন্তর্জাতিক সমাজকে এই বার্তাই দিয়েছে যে, অপরাধের শিকার মানুষের পরিচয় যা-ই হোক, বিচার পাওয়ার অধিকার তাঁদের রয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই পদে থেকে মানবাধিকার রক্ষা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন কার্যকর করার পক্ষে কাজ করেন। তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, তিনি মানবাধিকারকে কোনও নির্দিষ্ট দেশ বা জনগোষ্ঠীর সমস্যা হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে মানুষের মর্যাদা ছিল সর্বজনীন। জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ কিংবা জাতীয় পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের অধিকার সমানভাবে স্বীকৃত হওয়া প্রয়োজন— এই ধারণাই তাঁর কাজের মূল ভিত্তি।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে গাজা ও ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তাঁর ভূমিকা তাঁকে আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি অধিকৃত প্যালেস্তাইনি ভূখণ্ড নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার পরিষদ গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেন। কমিশন গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে গুরুতর সিদ্ধান্তে পৌঁছয়। তাদের প্রতিবেদনে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলা হয় এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বক্তব্যকে গণহত্যায় প্ররোচনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
এই সিদ্ধান্ত অবশ্য বিতর্কমুক্ত নয়। ইজরায়েল কমিশনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এবং প্রতিবেদনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আক্রমণ করে। কমিশনের সদস্যরা রাষ্ট্রসংঘের পক্ষে কোনও আদালতের রায় দেননি, তাঁদের তদন্তকারী সংস্থার নিজস্বভাবে অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের ক্ষমতাও ছিল না। অন্যদিকে, ওই কমিশনই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ও অন্যান্য প্যালেস্তাইনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছিল। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার দাবি কোনও পক্ষের ক্ষেত্রেই একতরফা হতে পারে না।
এখানেই নবী পিল্লের কাজের তাৎপর্য। মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে রাজনৈতিক পরিচয় বা শক্তিশালী রাষ্ট্রের অবস্থান যেন বিচারের মানদণ্ড নির্ধারণ না করে, সেটাই আন্তর্জাতিক আইনের মূল দাবি। তবে কোনও তদন্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত, কোনও রাষ্ট্রের অভিযোগ এবং কোনও উপযুক্ত আদালতের চূড়ান্ত রায় এক বিষয় নয়। গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রমাণ, আইনি সংজ্ঞা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা অত্যন্ত জরুরি। ন্যায়বিচারের প্রতি দায়বদ্ধতার অর্থ যেমন অপরাধের অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া, তেমনই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
বর্তমানে নবী পিল্লে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মায়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার আনা রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন। মামলাটির গুরুত্ব শুধু একটি জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক সমাজের সেই অঙ্গীকার, কোনও জনগোষ্ঠীকে জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হলে তা বিশ্বের উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠবে।
নবী পিল্লের নোবেল পুরস্কার তাই এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ বাড়ছে। একদিকে বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত, অন্যদিকে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির একাংশের আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করার প্রবণতা— এই দুইয়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে। আইন যদি কেবল দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য প্রযোজ্য হয়, আর শক্তিশালীরা তার বাইরে থাকার সুযোগ পায়, তা হলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
অবশ্য নোবেল পুরস্কার নিজে কোনও যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে না, গণহত্যার অভিযোগের নিষ্পত্তিও করতে পারে না। তবু পুরস্কারটি বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয়, আইন ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নৈতিক কাজ।