ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় গানের প্রশ্ন কেবল সঙ্গীত বা সংস্কৃতির আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তা বারবার এসে দাঁড়ায় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। সম্প্রতি কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ‘বন্দে মাতরম’-এর ছয়টি স্তবককে জাতীয় গানের সরকারি সংস্করণ হিসেবে চিহ্নিত করে যে নির্দেশিকা জারি করেছে, তা নিছক প্রোটোকল পরিবর্তন নয়, এটি এক গভীর রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন জানানো হচ্ছে যে, সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠানে এই সম্পূর্ণ রূপ গাওয়া বা বাজানো আবশ্যক এবং জনসমক্ষে এর সময় দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক— তখন প্রশ্ন জাগে, এতদিনের প্রচলিত রীতি ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তগুলির অবস্থান কোথায় দাঁড়াল?
১৯৫০ সালে সংবিধান সভা ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুই স্তবককে স্বীকৃতি দেয়। তারও আগে, ১৯৩৭ সালে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে আলোচনার পর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শে কেবল প্রথম দুই স্তবক গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কারণ পরবর্তী স্তবকগুলিতে মাতৃভূমিকে দেবীমূর্তিতে কল্পনা করা হয়েছে, যা বহুধর্মীয় ভারতের বাস্তবতায় বিতর্ক উস্কে দিতে পারে— এই আশঙ্কা থেকেই সেই সময় সংযমের পথ বেছে নেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর সংবিধান সভাও একই ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতাকে মর্যাদা দেয়। অর্থাৎ ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে যে সংক্ষিপ্ত রূপের ঐতিহ্য, তা আকস্মিক বা তড়িঘড়ি কোনও সিদ্ধান্তের ফল নয়, বরং তা ছিল এক অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় চেতনার পরিণতি।
এখন ছয় স্তবককেই বাধ্যতামূলক করা হল। এবার তা পতাকা উত্তোলনের মতো অনুষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত এবং ‘জনগণমন’-এর আগে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশিত হবে। এতদিন ‘জনগণমন’-এর সময় দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক ছিল, সেটিই ছিল সর্বোচ্চ রাষ্ট্রসম্মানের প্রতীক। এখন ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশনের সময়ও দাঁড়াতে হবে।
প্রোটোকলের সূক্ষ্ম এই বদলগুলি কেবল আনুষ্ঠানিকতার নয়, এগুলি প্রতীকের রাজনীতি।
এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে, যেখানে নির্বাচন আসন্ন। এখানকার রাজনৈতিক দলগুলি অভিযোগ তুলেছে যে, এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে এক বিশেষ মতাদর্শগত উদ্দেশ্য, যা বাংলার বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের পরিপন্থী। তাদের বক্তব্য, রবীন্দ্রনাথ যে সংক্ষিপ্ত সংস্করণে সম্মতি দিয়েছিলেন, তা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার স্বার্থে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। সেই ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করে পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ চাপিয়ে দেওয়া মানে অতীতের সহমর্মিতাকে অস্বীকার করা।
অন্যদিকে, বিজেপি পাল্টা প্রশ্ন তুলেছে, বাংলার প্রিয় দেবীমূর্তির বন্দনা নিয়ে আপত্তি কোথায়? তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে আনাই তাদের কৌশল। ফলে ‘বন্দে মাতরম’ আজ আর কেবল একটি ঐতিহাসিক গান নয়, তা এক নির্বাচনী তর্কের হাতিয়ার।
এই টানাপোড়েনের মাঝে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিল্প ও সাহিত্যচর্চার নিরপেক্ষতা। ‘বন্দে মাতরম’-এর স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন উনিশ শতকের এক বিশেষ সময়ের সন্তান। তাঁর লেখায় যে দেবীমূর্তি, তা ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদের এক রূপক। আবার রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় যে সংযম, তা বিশ শতকের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এক মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। দু’জনের ভাবনার পার্থক্যকে আজকের রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে মুখোমুখি দাঁড় করানো ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়।
রাজনীতি যখন সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে, তখন প্রতীকগুলি হয়ে ওঠে মেরুকরণের মাধ্যম। গণমাধ্যমের উচ্চস্বরে সেই বিভাজন আরও তীব্র হয়। ফলত এমন এক ভ্রান্ত ধারণা জন্ম নিতে পারে যে বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ যেন দুই বিপরীত মতাদর্শের প্রতিনিধি। অথচ বাস্তব হল, তাঁরা দু’জনেই তাঁদের সময়ের জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন। তাঁদের রচনাকে সময়ের পরিপ্রেক্ষিত ছাড়া বিচার করলে তা ইতিহাসের সরলীকরণ ছাড়া কিছু নয়।
জাতীয় গানের মর্যাদা ও প্রোটোকল নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সেই আলোচনায় যদি সংবেদনশীলতা ও ঐতিহাসিক বোধ অনুপস্থিত থাকে, তবে তা জাতীয় ঐক্যের বদলে বিভাজনের ইন্ধন জোগাতে পারে। ভারতের শক্তি তার বৈচিত্র্যে। সেই বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান দেখিয়েই অতীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আজও প্রয়োজন একই সংযম ও প্রজ্ঞা।
রাষ্ট্রের প্রতীকগুলি আমাদের সম্মিলিত স্মৃতি ও চেতনার অংশ। সেগুলিকে রাজনৈতিক সুবিধার মাপকাঠিতে পরিমাপ করলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিই বাড়ে। শিল্পী ও চিন্তকদের কাজ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বোঝা— রাজনীতির কাজ হওয়া উচিত সেই বহুমাত্রিকতাকে রক্ষা করা, দখল করা নয়। ‘বন্দে মাতরম’ যদি সত্যিই মাতৃভূমির বন্দনা হয়, তবে তার অন্তর্নিহিত শক্তি হবে ঐক্যে, বিভাজনে নয়।