উন্নয়ন ও পরিবেশ : প্রধানমন্ত্রীর বার্তা

Imae: IANS

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর কোনও একটি দেশ বা অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র মানবসভ্যতার অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে দিল্লিতে জাতীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি) আয়োজিত ‘দ্য ফিউচার অফ এনভাইরনমেন্টাল অ্যান্ড ক্লাইমেট ডাইনামিক্স’ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বরের এই সম্মেলনে ১৭টি দেশের বিচারপতি, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তি অংশ নিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি সামনে আনা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলিকে কার্বন নিঃসরণের জন্য অনেক সময় অন্যায্যভাবে দায়ী করা হয়। ভারতের মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ বিশ্ব গড়ের অর্ধেকেরও কম এবং উন্নত দেশগুলির মাথাপিছু নিঃসরণ ভারতের তুলনায় অনেক বেশি— এই তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায্যতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এখানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ইতিবাচক দিকটি হল, তিনি পরিবেশ রক্ষাকে উন্নয়নের বিরোধী হিসেবে দেখেননি। বরং তাঁর মূল বার্তা— দ্রুত উন্নয়ন এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব পাশাপাশি চলতে পারে। ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে উন্নয়নের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। একই সঙ্গে সেই উন্নয়ন যদি দূষণ, বন ধ্বংস এবং অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের উপর নির্ভরশীল হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তার মূল্য অত্যন্ত বেশি হবে। তাই উন্নয়নের পথটিকেই আরও পরিচ্ছন্ন ও টেকসই করে তোলা জরুরি।


ভারতের নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনেই ভারতের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ ক্ষমতার ৫০ শতাংশের বেশি এসেছিল অ-জীবাশ্ম জ্বালানি উৎস থেকে, যা ২০৩০ সালের নির্ধারিত লক্ষ্যের পাঁচ বছর আগেই অর্জিত হয়। ২০২৬ সালের জুনে এই অংশ বেড়ে ৫৪.১৮ শতাংশ হয়েছে।

সৌরশক্তির প্রসার, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক যানবাহন, জলপথে পরিবহণ এবং সবুজ হাইড্রোজেনের মতো উদ্যোগগুলির উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী মোদী দেখিয়েছেন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ করাই ভবিষ্যতের পথ। ২০১৪ সালের তুলনায় ভারতের সৌরবিদ্যুৎ ক্ষমতার বিপুল বৃদ্ধি সেই পরিবর্তনেরই একটি দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের জন্য ভারতের নতুন জলবায়ু লক্ষ্যে ২০৩৫ সালের মধ্যে স্থাপিত বিদ্যুৎ ক্ষমতার ৬০ শতাংশ অ-জীবাশ্ম উৎস থেকে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ভারতের প্রাচীন প্রকৃতি-ভাবনার উল্লেখও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় সংস্কৃতিতে প্রকৃতিকে কেবল সম্পদ হিসেবে নয়, জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সেই মূল্যবোধকে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পরিবেশ রক্ষার একটি স্বতন্ত্র ভারতীয় পথ তৈরি হতে পারে।

তবে জলবায়ু পরিবর্তনের লড়াই কেবল পরিসংখ্যান বা প্রযুক্তির বিষয় নয়। নীতি প্রয়োগ, পরিবেশ আইন কার্যকর করা, বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও সমান জরুরি। এই দিক থেকে এনজিটি-র আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিচারব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তাই একটি বৃহত্তর বার্তা বহন করে— পরিবেশ রক্ষা কোনও উন্নয়নের বাধা নয়, বরং ভবিষ্যতের উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। ভারতের সামনে এখন সেই বক্তব্যকে আরও কার্যকর বাস্তবে পরিণত করার সুযোগ। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, ন্যায্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মানুষের অংশগ্রহণ— এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে সত্যিকারের দ্রুত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন।