ভারতের উন্নয়নের পথে কৃষক এবং শহর— দুইয়েরই ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে কৃষকের পরিশ্রম দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে শহরের পরিকাঠামো, শিল্প, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। তাই গ্রাম ও শহরের সমান উন্নয়ন ছাড়া একটি সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই দুই ক্ষেত্রের উন্নয়নের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মহারাষ্ট্রের খরাপীড়িত কৃষকদের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি তিনি দেশের নগর উন্নয়নের নতুন দিশার কথাও তুলে ধরেছেন।
মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষকেরা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তাঁদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার সব রকম সাহায্য নিয়ে তাঁদের পাশে রয়েছে। তাঁর এই আশ্বাস যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করা শুধু একটি রাজ্য সরকারের দায়িত্ব নয়, গোটা দেশের দায়িত্ব। কৃষকের হাতে খাদ্য উৎপাদনের ভার। তাঁদের পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন। তাই কৃষকের দুর্দিনে সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেই হবে।
মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশের নেতৃত্বে রাজ্য সরকার গত কয়েক বছরে জল সংরক্ষণের জন্য উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে অনেক সময় পূর্বপ্রস্তুতিও যথেষ্ট হয় না। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। পিএম-কিষান সম্মান নিধি প্রকল্পের মতো উদ্যোগ কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভবিষ্যতেও কৃষকদের জন্য জল সংরক্ষণ, সেচের ব্যবস্থা, উন্নত কৃষি প্রযুক্তি এবং সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তার পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষককে শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব সাহায্য দেওয়াই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
অন্যদিকে, পুণে মেট্রো প্রকল্পের উদ্বোধন এবং নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী দেশের নগর উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আধুনিক শহর গড়ে তোলার জন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা অপরিহার্য। মেট্রো রেল শুধু যাতায়াতের সময় কমায় না, যানজট ও দূষণ কমাতেও সাহায্য করে। এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রা সহজ হয় এবং শহরের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। পুণের মতো দ্রুত সম্প্রসারিত শহরের জন্য এই ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পুণে মেট্রোর একটি বিশেষ দিক হল সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন। উন্নয়নের কাজে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ক্ষেত্রের অংশগ্রহণও যে গুরুত্বপূর্ণ, এই প্রকল্প তার উদাহরণ।
প্রধানমন্ত্রী শহরের উন্নয়নের পাশাপাশি ছোট শহরগুলিকেও অর্থনৈতিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন। এ উদ্দেশ্যে এক লক্ষ কোটি টাকার কেন্দ্রীয় সহায়তাসম্পন্ন আরবান চ্যালেঞ্জ ফান্ডের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শহরের পরিকাঠামো উন্নয়নে আরও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে। উন্নত রাস্তা, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, পরিবহণ এবং নাগরিক পরিষেবা মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে সাহায্য করবে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সাধারণ মানুষের হাতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সরাসরি উপভোক্তার কাছে পৌঁছনো, দুর্নীতি ও অপচয় কমানো এবং মানুষের আর্থিক ক্ষমতা বাড়ানো— এই লক্ষ্যগুলি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত। দারিদ্র্য কমলে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, বাজারে চাহিদা তৈরি হয় এবং শিল্প ও ব্যবসার প্রসার ঘটে।
সব মিলিয়ে কৃষকের কল্যাণ, গ্রামীণ উন্নয়ন, আধুনিক নগর পরিকাঠামো এবং কর্মসংস্থান— এই চারটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হওয়া উচিত বিকশিত ভারত গড়ার মূল পথ। উন্নয়নের সুফল যেন দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক থেকে শহরের সাধারণ নাগরিক, সকলের কাছে পৌঁছয়। কেন্দ্র, রাজ্য, স্থানীয় প্রশাসন এবং বেসরকারি ক্ষেত্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এই লক্ষ্য পূরণ করতে পারে। আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে সেই আশাকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে প্রতিটি প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং মানুষের কাছে তার সুফল পৌঁছনো নিশ্চিত করতে হবে। তবেই উন্নয়নের যাত্রা সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন ও স্থায়ী হবে।