স্ত্রী বিষয়ক মিথ

প্রতীকী চিত্র

সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে দিল্লি হাইকোর্ট জানিয়েছে, শিক্ষিত বা উপার্জন করার যোগ্যতা থাকা মানেই কোনও নারী বাস্তবে উপার্জন করছেন, এমন ধরে নেওয়া যায় না। ফলে, বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি যদি আর্থিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তবে শুধুমাত্র ‘তিনি উপার্জন করতে পারতেন’— এই যুক্তিতে ভরণপোষণের দাবি খারিজ করা যায় না। আদালত স্পষ্টভাবে বলেছে, ‘উপার্জনে সক্ষম’ এবং ‘বাস্তবে উপার্জন করছেন’— এই দুই অবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই পর্যবেক্ষণ কেবল একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়। এটি আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা একটি গভীর সামাজিক ভ্রান্ত ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—‘অলস স্ত্রী’র মিথ।
ভারতীয় সমাজে বিয়ের পর বহু নারীই নিজের পেশা বা সম্ভাব্য কর্মজীবন ছেড়ে দেন সংসার সামলানোর জন্য। কখনও পরিবার বা সমাজের প্রত্যাশায়, কখনও স্বেচ্ছায়, আবার কখনও নীরব চাপের ফলে তাঁরা কর্মক্ষেত্র থেকে সরে দাঁড়ান। এই ত্যাগের ফলেই গড়ে ওঠে একটি সুসংগঠিত পারিবারিক পরিকাঠামো, যার ওপর নির্ভর করে বহু পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কিন্তু এই শ্রমের কোনও আর্থিক হিসাব থাকে না— ব্যাঙ্কের বা করের নথিতেও নয়। তাই প্রায়ই তা ‘কাজ’ হিসেবেই গণ্য হয় না।

এই কারণেই দিল্লি হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে, সংসার চালানো এবং পরিবারকে ধরে রাখার জন্য একজন স্ত্রীর যে শ্রম প্রয়োজন, তার স্পষ্ট অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। রান্না, ঘরদোর সামলানো, সন্তান প্রতিপালন, বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা– এসব কাজকে যদি বাজারের শ্রম হিসেবে ধরা হয়, তবে তার আর্থিক মূল্য কম নয়। কিন্তু বাস্তবে এই শ্রমকে স্বাভাবিক দায়িত্ব বলে ধরে নিয়ে তার মূল্য প্রায় অস্বীকারই করা হয়।
তবে বিষয়টি শুধু অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংসার টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে যে মানসিক এবং আবেগসঞ্জাত শ্রম প্রয়োজন, তার মূল্যায়ন আরও কঠিন। একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবন যেন নির্বিঘ্নে চলতে পারে— তার জন্য যে পরিকল্পনা, সংগঠন ও মানসিক প্রস্তুতি দরকার, তা প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যায়। কখন কী রান্না হবে, সন্তানের পড়াশোনা, বয়স্কদের চিকিৎসা, বাড়ির কাজের সময়সূচি, সব মিলিয়ে এক ধরনের অদৃশ্য ব্যবস্থাপনার কাজ চালিয়ে যেতে হয় প্রতিদিন।
এর সঙ্গে যুক্ত থাকে আবেগজড়িত শ্রম। সম্পর্কের টানাপোড়েন সামলানো, পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বস্তি বজায় রাখা, হতাশা বা বিরক্তিকে আড়াল করে একটি শান্ত পরিবেশ তৈরি করা— এসবই সংসারের ভিতকে শক্ত রাখে। কিন্তু এই আবেগজনিত শ্রমের কোনও স্বীকৃতি সাধারণত দেওয়া হয় না। বরং সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা চালু রয়েছে— স্বামী অর্থ উপার্জন করেন, স্ত্রী সেই অর্থে নিরাপত্তা পান, তাই স্ত্রীর অবদান যেন গৌণ।

বাস্তবে এই যুক্তি অত্যন্ত অসম্পূর্ণ। কারণ একটি পরিবারের অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনেও প্রায়শই স্ত্রীর অদৃশ্য শ্রম কাজ করে। অনেক পুরুষই কর্মক্ষেত্রে মনোনিবেশ করতে পারেন কারণ বাড়ির সমস্ত দায়িত্ব কেউ একজন নীরবে সামলে নিচ্ছেন। সেই শ্রম যদি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়, তবে পারিবারিক কাঠামো কত দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে, তা বোঝা কঠিন নয়।


এই প্রেক্ষাপটে আদালতের পর্যবেক্ষণ সমাজের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বিবাহিত জীবনে একজন নারীর শ্রমকে অলসতা বা নির্ভরতা বলে ব্যাখ্যা করা অন্যায়। সংসার চালানো কোনও নিষ্ক্রিয় কাজ নয়; বরং তা এক ধরনের পূর্ণকালীন দায়িত্ব, যেখানে শারীরিক, মানসিক ও আবেগসঞ্জাত— তিন ধরনের শ্রম একসঙ্গে জড়িত।

তবে কেবল আদালতের রায়ে এই মানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক স্বীকৃতি এবং সচেতনতার। পরিবারের ভেতরে নারীর কাজকে সম্মান দেওয়া, অর্থনৈতিক মূল্যায়নের প্রশ্নে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা— এই সবই জরুরি। ‘অলস স্ত্রী’র ধারণা ভাঙা তাই শুধু আইনি প্রয়োজন নয়, সামাজিক ন্যায়বিচারেরও অংশ। সংসারের অদৃশ্য শ্রমকে দৃশ্যমান করে তোলার মধ্যেই রয়েছে একটি আরও সমতাভিত্তিক সমাজের সম্ভাবনা।