বর্ষাকাল ও কলকাতার জরাজীর্ণ বাড়িগুলি

Photo: Magnific

বর্ষাকালে কলকাতায় জরাজীর্ণ বাড়ি ভেঙে পড়া এবং তাতে প্রাণহানি বা গুরুতর আঘাতের খবর একটি বহুল পরিচিত ঘটনা। এই ধরনের জীর্ণ বাড়িতে বসবাস করতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ যাচ্ছে দেখেও হুঁশ হচ্ছে না অনেকের। অভিযোগ, অধিকাংশ পুরনো বাড়ির ক্ষেত্রেই বাসিন্দারা বাড়ির সংস্কার করানোর পথে হাঁটেন না। অন্যত্র গিয়ে থাকতেও রাজি হন না। প্রশ্ন উঠেছে, এই রোগ কি সারবে নতুন সরকারের আমলে? এখনও পর্যন্ত বিজেপি সরকারের তরফে এ ব্যাপারে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। যদিও প্রশাসনিক কর্তাদের দাবি, পুরসভার আইন ইতিমধ্যেই সংশোধন করে সরল করা হয়েছে। বেশ কিছু ছাড়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে তারপরেও কাজের কাজ হচ্ছে না কেন, সেটা দেখা হবে। সে ক্ষেত্রে পুর আইন সংশোধন ছেড়ে নতুন আইন পাশ করানোর পথেও হাঁটতে পারে সরকার। আসলে বিপজ্জনক বাড়ি সংস্কারে পুর আইন খাতায়-কলমেই রয়েছে।

বাস্তবে তার কোনও ক্ষমতা নেই। বাড়িওয়ালা-ভাড়াটের ঝামেলায় বাড়ির সংস্কার হয়ে ওঠে না। পুরসভাকে আরও আইনি ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন আছে। অন্যদিকে গৃহমালিক সমিতির দাবি এই যে, বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। কম ভাড়ায় ভাড়াটেরা থাকেন বলে সংস্কারের সময়েও তাঁদের যৎসামান্যই যোগদান পাওয়া যায়। মূল ভাড়াটে আইনের সংস্কার না হলে পুরনো বিপজ্জনক বাড়ির সংস্কার প্রক্রিয়া অসম্ভব। বর্তমানে কলকাতায় বিপজ্জনক বাড়ির সংখ্যা প্রায় ৩৭০০। এর মধ্যে অন্তত ১৫০টি অতি বিপজ্জনক বাড়ি। কিন্তু বছরের পর বছর সেই সব বাড়ির সংস্কার হচ্ছে না। বহু ক্ষেত্রে মালিকেরও খোঁজ মিলছে না। কোথাও আবার মালিক থাকলেও ভাড়াটেরা সংস্কারে এগিয়ে আসছেন না। এমন উদাহরণও প্রচুর, যেখানে প্রোমোটারকে দিয়ে সংস্কার করানোর পরিকল্পনা হলেও সহমত হচ্ছে না কোনও পক্ষই। পুরনো ঘর ধরে রাখলে বহুতল ওঠার পরে ফ্ল্যাট পাওয়া যাবে ভেবে নিয়েও থেকে যাচ্ছেন অনেকে। ফি-বছর টানা কয়েক দিন বৃষ্টি হলেই এই সব বাড়ি ভেঙে পড়ছে।

১৯৮০ সালের পুর আইন অনুযায়ী, এমন বাড়ির ক্ষেত্রে ৪১১ (১) ধারা অনুযায়ী, প্রথমে ‘বিপজ্জনক’ নোটিস দিতে পারে পুরসভা। এর পরেও সংস্কারের কাজ না হলে ৪১১ (২) ধারায় বাড়ির সামনে ‘বিপজ্জনক বাড়ি’ লেখা হোর্ডিং টাঙাতে পারে। তাতেও কাজ না হলে ৪১১ (৩) ধারায় বাড়ির মালিককে ব্যবস্থা নিতে সতর্ক করা হয়। এরপরে পুরসভা ৪১১ (৪) ধারায় বাড়ির বিপজ্জনক অংশ ভেঙে দিতে পারে। পুরসভার বিল্ডিং দফতরের মতে এই সময়েও বাসিন্দারা বাড়ি ছাড়তে রাজি না হলে পুর আইনের ৪১২ (১) ধারায় বাড়ি খালি করার নোটিস দেয় পুরসভা। ৪১২ (২) ধারায় পুলিশকেও পদক্ষেপ করতে বলতে পারে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সময় এলেই ভাড়াটেরা আদালতে গিয়ে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন। জোর করে তাঁদের সরানোর ক্ষমতা পুরসভার নেই। এমন পরিস্থিতির জন্যই পুর বিল্ডিং আইনের ৪১২ নম্বর ধারা সংশোধন করে ৪১২এ ধারা আনা হয়। যেখানে বলা আছে, মালিক পুরনো বাড়ির সংস্কারে এগিয়ে এলে তাঁকে বাড়তি ছাড় দেওয়া হবে।


ভাড়াটেরাও সংস্কার করতে পারবেন। কোনও পক্ষই রাজি না হলে পুরসভা তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে সংস্কার করাবে। কিন্তু তা-ও বহু ক্ষেত্রেই বাড়িওয়ালা-ভাড়াটেরা সংস্কারে আগ্রহ দেখান না। ভাড়াটেরা দাবি তোলেন, সংস্কারের জন্য জায়গা ছেড়ে গেলে আর তাঁদের বাড়িতে ফেরা হবে না। ৪১২এ ধারায় ভাড়াটেদের ‘বাসিন্দা শংসাপত্র’ দেওয়ারও সংস্থান করা হয়। কিন্তু কলকাতা পুরসভার ২৪ নম্বর ওয়ার্ড, যেখানে প্রথম এমন শংসাপত্র দেওয়া হয়, সেখানেই পুরনো বাড়ির বিপদ কাটেনি। এই পরিস্থিতিতে ওই শংসাপত্র দেওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পুরসভা সূত্রের খবর, শহরে প্রচুর সংখ্যায় বিপজ্জনক বাড়ি রয়েছে, একটি বিশেষ ওয়ার্ডে।

সেখানকার প্রাক্তন পুরপ্রতিনিধির মতে, বেশিরভাগ বিপজ্জনক বাড়ির মালিকের খোঁজ পাওয়া যায়নি। বাড়ির মালিক সংস্কারে এগিয়ে না এলে ভাড়াটেদের শংসাপত্র দিয়ে কী লাভ? তা হলে সমাধান কিসে? উত্তর মেলে না কোনও পক্ষ থেকেই। এমন বাড়ির ক্ষেত্রে ভারি ও লাগাতার বৃষ্টির ফলে ছাদের জমা জল অতিরিক্ত ভার তৈরি করে, ফাটল দিয়ে জল দেওয়াল ও ভিতের গভীরে ঢুকলে কাঠামো ভেঙে ধস নামে। তাই বাড়িগুলিকে বোর্ড ঝুলিয়ে বিপজ্জনক বলে শনাক্ত করলেই প্রশাসনের দায় শেষ নয়, সময় থাকতে এই সমস্যার সমাধানও করতে হবে। এ কথা ঠিক যে, বহু ক্ষেত্রে এই বাড়িগুলির সঙ্গে মালিকানা, ভাড়াটে বা দখল নিয়ে দীর্ঘ আইনি জটিলতা থাকে। এক পক্ষের দাবি, বাসিন্দারা জবরদখল করে রয়েছেন; অন্য পক্ষের বক্তব্য, তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বাড়ির সংস্কার হয়নি। এই ধরনের মামলা-মকদ্দমা আইনের সময় ও পথ মেনে এগোক, কিন্তু এর কোনওটিকেই মানুষকে অরক্ষিত রাখার কারণ হয়ে উঠতে দেওয়া যায় না। অতএব, প্রতিটি বিপজ্জনক বাড়ির ক্ষেত্রে লিখিত সমীক্ষা প্রয়োজন। কোন অংশ অবিলম্বে খালি করতে হবে, মেরামত বা সংস্কারের সুযোগ কতটা, কোন অবস্থায় ভাঙাই সমাধান— তা স্পষ্টভাবে স্থির করতে হবে এবং জানাতে হবে। বাসস্থান ব্যবহারের উপযুক্ত না থাকলে আইনানুগ নোটিস দিয়ে, তা খালি করানো এবং প্রয়োজনে ভাঙার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। ইতিমধ্যেই কলকাতা পুরসভার আইনে বিপজ্জনক বাড়ি ভাঙা ও পুনর্নির্মাণের পথ রাখা আছে, নতুন আইনের অপেক্ষায় না থেকে বিদ্যমান বিধির বাস্তব প্রয়োগেই বরং সদিচ্ছা ও সমন্বয় বেশি জরুরি।

এই সুযোগে সরকার বাড়ি অধিগ্রহণ করছে— নাগরিকের মনে এমন শঙ্কা দৃঢ়তা ও স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তাকেই প্রকট করে তোলে। তবে, বাড়ি খালি করার অর্থ যেন নির্বিচারে উচ্ছেদ না হয়। কারণ, বহু ক্ষেত্রেই বাসিন্দাদের বাড়ি খালি করায় অনাগ্রহের কারণ হয়ে ওঠে উপযুক্ত পুনর্বাসনের অনিশ্চয়তা। এ ক্ষেত্রে আইন ও মানবিকতার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষিত হবে, আদালতের বিভিন্ন রায়েই তার দিকনির্দেশ মিলেছে। আইনি কাঠামো অনুযায়ী পুনর্বাসনের প্রধান দায় বাড়ির মালিকের। তবে, পুরসভাকেও এ নিয়ে একটি স্পষ্ট নগর-নীতি প্রণয়ন করতে হবে। তার মধ্যেই থাকবে ঝুঁকি নির্ণয়, সময়সীমা মেনে সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের পদ্ধতি, বিকল্প আবাসনের দায়িত্ব নির্ধারণ। অস্থায়ী আবাসনের খরচ কে, কীভাবে বহন করবে এবং পুনর্নির্মাণের পরে বাসিন্দাদের কীভাবে ফিরিয়ে আনা হবে, মালিক বেপাত্তা হলে প্রশাসন কোন দায়িত্ব পালন করবে— সেই রূপরেখাও ‘অ্যাকশন প্ল্যান’টির অংশ হওয়া দরকার। আইন পরিবর্তনের প্রতীক্ষা দীর্ঘমেয়াদি, এখন জরুরি ভিত্তিতে এই পরিকল্পনাটি নিয়েই অগ্রসর হওয়া বাঞ্ছনীয়, কারণ পুরসভার হিসাবেই শহরে বিপজ্জনক বাড়ি প্রায় ৩,৭০০। তারপরও সেগুলির সংস্কার বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা আপৎকালীন নয় কেন, সেটাই প্রশ্ন।