১৯৩০ সালের ডিসেম্বর মাসে প্যারিসে জঁ-লুক গদারের জন্ম। ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ৯১ বছর বয়সে রোড-এ তাঁর বাসভবনে মৃত্যু হয় তাঁর৷ তাঁর মৃত্যুটি ‘অ্যাসিস্টেড সুইসাইড’ বা স্বেচ্ছামৃত্যু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত, যা সুইজারল্যান্ডে বৈধ। গদারের আইনি পরামর্শদাতা জানিয়েছিলেন যে, তিনি ‘একাধিক অক্ষমতা সৃষ্টিকারী শারীরিক সমস্যায়’ ভুগছিলেন, তবে পরিবারের একজন সদস্য বলেছিলেন, ‘তিনি অসুস্থ ছিলেন না, কেবল অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।’ মৃত্যুর সময় মিয়েভিল তাঁর পাশে ছিলেন। তাঁর মৃতদেহ দাহ করা হয় এবং কোনও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়নি।
চলচ্চিত্র দুনিয়ার সবচেয়ে বিতর্কিত এই মানুষটি সম্পর্কে অনেকের ধারণা, তিনি হচ্ছেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্রকার। কারও মতে তিনি সবচেয়ে অযোগ্য না হলেও, লোকটা একেবারেই অসহ্য। তিনি একই সঙ্গে নিন্দিত ও নন্দিত। অর্থাৎ অনেকেই যখন তাঁর প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত, অনেকে আবার তাঁর উপর অসম্ভব বিরক্ত। কিন্তু আমরা মনে করি গদার তাঁর প্রথম ছবি ‘ব্রেথলেস’-এর মাধ্যমে ফরাসি তথা বিশ্বচলচ্চিত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। তিনি চলচ্চিত্রের ব্যাকরণকে আমূল পালটে দিয়েছিলেন এবং এক নতুন চলচ্চিত্র ভাষার জন্ম দিয়েছিলেন, যা একান্তভাবেই তাঁর নিজস্ব। সমালোচকরা তাঁকে জেমস জয়েস কিংবা পাবলো পিকাসোর সঙ্গে তুলনা করে সঠিক কাজটাই করেছেন। এই দুই মহান প্রতিভার সঙ্গে তুলনা করার অর্থ, এই শতাব্দীর সাহিত্য কিংবা চিত্রকলায় তাঁরা যা ঘটিয়েছেন, চলচ্চিত্রে গদার তাই করতে চেয়েছিলেন।
তখন তিনি ছবির জগতে প্রতিষ্ঠিত। ‘কাহিয়ে দ্যু সিনেমা’-য় (ডিসেম্বর ১৯৬২) এক সাক্ষাৎকারে গদার বলেছিলেন, ‘এখনও আমি নিজেকে সমালোচক বলেই মনে করি। একদিক থেকে বলতে গেলে আগের চেয়ে আমি অনেক বেশি সমালোচক হয়ে উঠছি। সমালোচনা লেখার পরিবর্তে আমি ছবি বানাই। আমি নিজেকে প্রাবন্ধিক মনে করি, কখনও উপন্যাসের ধরনে প্রবন্ধ লিখি, কিংবা প্রবন্ধের রীতিতে উপন্যাস, তফাৎটা শুধু এই যে, লেখার বদলে আমি ছবি করি। সিনেমা যদি কোনোদিন উঠে যায়, আমি সেই ঘটনাকে মেনে নেব, টেলিভিশনে চলে যাব, যদি টেলিভিশন উঠে যায়, আমি আবার কাগজ-কলম নিয়ে বসব। আত্মপ্রকাশের জন্য যতরকম শিল্প আছে, সব শিল্পের মধ্যেই একটা ধারাবাহিকতা চলছে, সব শিল্পই এক।’
ঠিক কাছাকাছি সময়ে প্রাচ্যে ঋত্বিক কুমার ঘটক প্রায় একই রকম একটি মন্তব্য করেছিলেন, ‘সিনেমার থেকে বেটার কোনো শিল্পমাধ্যম পেলে সিনেমাকে আমি লাথি মেরে চলে যাব।’ চিন্তনায়কদের ভাবনার মধ্যে কী আশ্চর্য মিল! বিস্ময় আজও গেল না আমার। বার্তোলুচ্চিকে বাদ দিয়ে সমকালীন আর কোন চলচ্চিত্রকারকে নিয়ে এত লেখা হয়নি। জঁ কোলেত, যিনি গদারের উপর প্রথম বই লিখেছেন, তিনি বলেছেন, ‘তাঁর ছবির আসল চাবিকাঠিটা রয়েছে ডকুমেন্টারি ও ফিকশন-এর দ্বান্দ্বিক খেলার মাঝখানে।’ গদার নিজেও মনে করেন, ‘সৌন্দর্য ও সত্যের দুটো দিক রয়েছে, ডকুমেন্টারি ও ফিকশন। যে কোনও একটা নিয়ে আপনি আরম্ভ করতে পারেন। আমার আরম্ভের জায়গাটা হচ্ছে ডকুমেন্টারি।’
স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি লাতিন কোয়ার্টার্স সিনে ক্লাব এবং সিনেমাথেকে নিয়মিত যাচ্ছেন। ওখানেই তিনি পরিচিত হন আঁদ্রে বাজাঁ, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো, এরিক রোমার ও জ্যাক রিভেতের সঙ্গে। ১৯৫০ সালে তাঁর বয়স যখন ২০ বছর, রোমার ও রিভেতের সঙ্গে তিনি ‘গেজেট দ্যু সিনেমা’ বার করছেন, বেশ কয়েকটি সংখ্যা বেরিয়েছিল। তখন রিভেত আর রোমার তাঁদের প্রথম শর্ট ফিল্মগুলো তুলছিলেন, বেশ কয়েকটিতে গদার অভিনয় করেন।
১৯৫২ থেকে ৫৪-র মধ্যে লিখেছেন ‘কাহিয়ে দ্যু সিনেমা’-য়, প্রায়ই ব্যবহার করছেন হান্স লুকাস ছদ্মনাম। এই সময় বাবার সঙ্গে উত্তর আমেরিকায় প্রচুর ঘুরে বেড়িয়েছেন। অল্প সময়ের জন্য প্যারিসে ফিরে এসে তিনি সুইজারল্যান্ডে ফিরে যান। সেখানে গ্র্যান্ড ডিকসেন্স ড্যাম-এ শ্রমিকের কাজ করেন। ওখানে যে পারিশ্রমিক পান তাই দিয়ে তাঁর প্রথম ডকুমেন্টারি তোলেন ১৯৫৪ সালে। ছবির নাম ‘অপারেশন নিউটন’, ওই বাঁধ তৈরির বিষয় নিয়ে। প্যারিসে ১৯৫৬ থেকে ৫৯ ত্রুফোর মতো ‘কাহিয়ে দ্যু সিনেমা’ এবং ‘আর্টস’-এ নিয়মিত লেখেন। ১৯৫৭ সালে এরিক রোমারের চিত্রনাট্য থেকে আর একটি সিনেমা করেন ‘অল বয়েজ আর কল্ড প্যাট্রিক’ (১৯৫৭)। মিউজিক বাখ থেকে বিঠোফেন।
বাস্তবকে যথাযথ রূপায়িত করার জন্য, যান্ত্রিকভাবে রূপ দেওয়ার জন্য মুভি ক্যামেরার আবিষ্কার হয়েছিল। লুমিয়ের ভাইয়েরা অন্তত তাই ভেবেছিলেন। মেলিয়েস বাস্তবকে রূপ দিতে চাননি, তিনি চাইছিলেন ফ্যান্টাসির পুনর্নির্মাণ। কোনও বিশেষ পদ্ধতি বা আগে থেকে গদার সরে এসেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চান না। দর্শক ছবির সঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠুক এটাই তিনি চান, দর্শক যাতে কৌতূহলশূন্য উদাস ভঙ্গিতে হল থেকে বেরিয়ে না যায়। তাঁর ছবি তরলিত, আকস্মিক গতি পরিবর্তনের দ্বারা তা ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। তারা নানাবিধ প্রশ্ন তৈরি করে। গদার একবার বলেছিলেন, আপনার হাতে কিছু টাকা থাকলেই আপনি আমার ছবি দেখতে আসতে পারবেন না, বা বুঝতে পারবেন না। হিস্ট্রি অফ আর্ট সম্বন্ধে আপনার মিনিমাম ধারণা থাকতে হবে। যেমন গদার ‘কনটেম্পট’ ছবিতে একটি কোটেশন ব্যবহার করেন। এটি হল, ‘দ্য সিনেমা হ্যাজ নো ফারদার…’, এটি লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় সিনেমা করার বেশ কিছু বছর পরে করেছিলেন। কারণ তাঁরা মনে করতেন, সিনেমা মানেই বিনোদন ও বাণিজ্যের ব্যবস্থা। সিনেমা যে একটা উঁচু দরের শিল্প তা তাঁরা বোঝেননি, বা বুঝতে চাননি। এখন সিনেমার ইতিহাস না পড়া থাকলে গদারের ‘কনটেম্পট’ ছবির মধ্যে এই কোটেশনটির তাৎপর্য দর্শক বুঝতে পারবেন না।
একদা এক পরিচালক যিনি সিনেমার নিয়মকানুনে বিশ্বাস করতেন, গদারকে জিজ্ঞেস করেন— তিনি অন্তত এটা মানেন কিনা যে, সিনেমার একটা আরম্ভ আছে, একটা মধ্যপর্ব আছে এবং একটা সমাপ্তি আছে। গদার বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ তা নিশ্চয় আছে, কিন্তু এভাবেই যে প্রথা মানতে হবে তার কোনও মানে নেই। আমরা দেখেছি ‘ব্রেথলেস’-এ খুব স্পষ্টভাবেই একটা আদি-মধ্য-অন্তের একটা নিয়ম মানা হয়েছে। কিন্তু ওই অর্থে নয়। কিন্তু ছবির সমাপ্তির মধ্যেই ছবিটা শেষ হয়ে যায় না। আমরা আসলে কী, গদারের কাছে তা খুব জরুরি নয়, তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় হলো আমরা আসলে আমাদের নিয়ে আমরা যা ভাবছি।’
সমালোচক হিসেবে যে ‘মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার’ কথা তিনি বলেছিলেন, তাকেই তিনি ক্যামেরায় তুলে ধরলেন। এলো পুরুষের নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতা এবং নারীর বিশ্বাসঘাতকতা। গদারের ছবিতে চরিত্ররা খুব কম সময়ই তৈরি করেছে মানবিক সম্পর্ক। তাঁর ছবির চরিত্ররা প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে কথা বলে, রাজনীতি নিয়ে কথা বলে, কিন্তু দুটোর কোনোটাই সাফল্যের সঙ্গে করতে পারে না। তাঁর ছবিতে এক ধরনের সাংস্কৃতিক অন্তর্ঘাতের ব্যাপারটা ধরা পড়ে। ‘ব্রেথলেস’ ছবির আগে এবং এই ছবির পরে চলচ্চিত্রের ইতিহাস আর একরকম রইল না। আমূল বদলে গেল, বদলে গেল ফর্ম আর করটেন্ট। এডিটিং স্টাইল। আমরা পেলাম জাম্প কাট-এর রাজকীয় মহিমা।
গদারকে একবার এক চিত্রসাংবাদিক প্রশ্ন করেন, আপনার ছবিতে তো প্রচুর রক্ত দেখা যায়। তার উত্তরে গদার বলেন, ‘ওগুলো রক্ত নয়, ওগুলো সব লাল রং।’ হিংসা সম্বন্ধে গদারের ধারণা হলো, দর্শক অল্পবিস্তর হিংসা দেখতে পছন্দ করে, কিন্তু এখানেও তিনি চলতি হওয়ার পন্থী নন। তিনি দর্শককে ঝাঁকুনি দিতে চান, অস্বস্তিতে ফেলতে চান।
‘পিয়েরো লে ফু’ ছবির আরম্ভের শটটা নেওয়ার আগেই ভেবেচিন্তে ঠিক করে রাখা হয়েছিল, ছবির শেষটা লোকেশন শট নেওয়ার মুহূর্তে উদ্ভাবিত হয়। নুভেল ভাগ পরিচালকেদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিমান, সবচেয়ে উজ্জ্বল, সবচেয়ে পণ্ডিত ও সবথেকে বিদগ্ধ, সবচেয়ে বিতর্কিত ও সবচেয়ে রাজনৈতিক জঁ-লুক গদার। গদার যখন আনা কারিনাকে বিয়ে করছেন, আর আনা কারিনার সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর যেসব ছবি করেছেন, এ দুয়ের মধ্যে যে পার্থক্য কেউ যদি মনোযোগ দিয়ে সেটা লক্ষ্য করেন তাহলেই দেখতে পাবেন, সিনেমায় আর কোনও পরিচালক উপন্যাসের নায়কের মতো এতটা বিবর্তিত হননি।
প্রকৃতপক্ষে গদারের চলচ্চিত্রে সবচেয়ে অসম্ভব বিষয়টি নিয়ে আসে নর-নারীর কমিউনিকেশন। তাঁর নায়ক সর্বাধিক ব্যর্থতা বহন করে যেহেতু বর্তমান সমাজের ‘ভ্যালুজ’-এর সঙ্গে কিছুতেই খাপ খাওয়াতে পারে না। ‘পিয়েরো’ ডিনামাইটের তারে আগুন লাগিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অস্থিরতায় আপন অস্তিত্ব বিলোপ করে।
কিন্তু মৃত্যুর পরেও গদার বেঁচে থাকেন। মানবিক সেন্টিমেন্ট ইত্যাদিকে গদার তিলমাত্র মূল্যারোপ করেন না জেনে তাঁকে নন ফিল্ম থেরাপিস্ট আখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। কেননা গদার জানতেন নিও-ক্যাপিটালিজম-এর আওতায় সেন্টিমেন্ট প্রভৃতির কোনও আন্তরিক মূল্য থাকে না। জীবনের ইলিউশনগুলিকে চলচ্চিত্রের শিল্পতত্ত্বে সমীকরণ আর চলচ্চিত্রের শিল্পকে জঁ-লুক গদার এক নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে গেছেন বলে বিশ্বাস করা যায়।