নয়াদিল্লিতে সদ্য সমাপ্ত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন কী নিছক আর একটা গতানুগতিক বহুপাক্ষিক বৈঠক হিসেবে শেষ হলো, নাকি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সত্যিই কার্যকরী কিছু হলো? শীর্ষ বৈঠকের শেষে এটাই প্রশ্ন। বর্তমান বিশ্ব-রাজনীতির গভীর বিভাজনের মধ্যে ভারত এবারের ব্রিকস সম্মেলনে এমন একটি মঞ্চ তৈরি করতে পেরেছে, যেখানে পরস্পরের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বহু ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধী দেশের রাষ্ট্রনেতারা একই টেবিলে বসেছেন। ভারতের সভাপতিত্বে সম্মেলনের শেষ দিনে ‘দিল্লি ঘোষণাপত্র’ সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে।
কূটনৈতিক দিক থেকে দেখতে গেলে এটা নিঃসন্দেহে একটা বড় প্রাপ্তি। তবে বহুপাক্ষিক প্রাপ্তির চেয়ে এই সম্মেলনকে ঘিরে বিভিন্ন দেশের মধ্যে অনেক দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, সমঝোতা এবং চুক্তি হয়েছে যাতে দ্বিপাক্ষিক ভাবে বিভিন্ন দেশের যথেষ্ট উপকার হয়েছে। অর্থাৎ ভারতের সাজানো মঞ্চে ভারতেরই আমন্ত্রণে আসা বিভিন্ন দেশের কূশীলবেরা বেশ ভাল ব্যবসা করে গেলেন। এই যে সকলকে হাজির করে সামনা-সামনি বসানো এটাও কিন্তু একটা বড় কূটনৈতিক সাফল্য। আর যেসব দেশ এবারের ব্রিকসে দ্বিপাক্ষিক বানিজ্য করে গেল তারাও ভারতকে নিশ্চয়ই ধন্যবাদ দেবে, কারণ আজকের পৃথিবীতে একসঙ্গে বসাটাও সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।
এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যেসব বিশ্বনেতা এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে চিনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং অন্যতম। ভারত-চিন সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে ওনার ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে আসাটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০-র সীমান্ত-সংঘর্ষের পর দুই দেশের মধ্যে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তার মাঝেই চিনা রাষ্ট্রপ্রধান ব্রিকস সম্মেলনে দিল্লিতে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁদের এই সাক্ষাৎ ভারতের মাটিতে সাত বছর পর ঘটল। দুই নেতা ভারত-চিন সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিতে দেখতে এবং এই দুই দেশের মধ্যেকার মতপার্থক্য যাতে দুদেশের মধ্যে বিরোধে পরিণত না হয়, সেই বার্তাই দিয়েছেন।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, ব্রিকসের বর্তমান পরিসরে এমন দেশও রয়েছে যাদের নিজেদের মধ্যে গভীর সংঘাত রয়েছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি একই মঞ্চে; রাশিয়া ও কিছু পশ্চিমী দেশের মধ্যে সংঘাতের মধ্যেও রাশিয়া সেই টেবিলে; আর ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত, বাণিজ্য, কৌশলগত প্রভাব এবং পাকিস্তান-সম্পর্কিত প্রশ্নে চলেছে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন, সেই চিনও একই ঘোষণাপত্রে সম্মত হয়েছে। এই কারণেই ব্রিকসকে শুধু পশ্চিম-বিরোধী জোট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি ক্রমশ এমন একটি বহুমেরুর কূটনৈতিক মঞ্চে পরিণত হচ্ছে যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলিও অভিন্ন স্বার্থে সহযোগিতা করতে বাধ্য হচ্ছে।
দিল্লি সম্মেলনে ভারতের প্রকৃত কূটনৈতিক সাফল্য কোনও একটি চমকপ্রদ চুক্তি নয়; বরং এতগুলি বৈচিত্র্যময় রাষ্ট্রকে একটি যৌথ ঘোষণায় সম্মত করানো। ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রগুলির সমতা, বহুপাক্ষিকতা, অন্তর্ভুক্তি এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বের পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং বিশ্ব ব্যাঙ্ক, ইন্টারন্যাশনাল মনেটরি ফান্ড প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কারের দাবিও পুনর্ব্যক্ত হয়েছে ব্রিক্স-২০২৬-এর ঘোষণাপত্রে।
নয়াদিল্লির এবারের এই ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের দীর্ঘদিনের গ্লোবাল সাউথ কেন্দ্রিক কূটনীতির একটি সাফল্য দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর বক্তব্যে পিরামিড অফ প্রিভিলেজ কে প্ল্যাটফর্ম অফ পার্টনারশিপে রূপান্তরের যে কথা এসেছে, তা আসলে ভারতের বৃহত্তর কূটনৈতিক আকাঙ্ক্ষারই প্রকাশ— অর্থাৎ বহুমাত্রিক বিশ্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলির ভূমিকা বাড়ানো।
এই সম্মেলনকে ঘিরে দ্বিপাক্ষিক ক্ষেত্রে অন্য কয়েকটি দেশের মত ভারতও নিজের জন্যে বেশ কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা করে নিতে পেরেছে। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, সরবরাহ-শৃঙ্খল, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, বিনিয়োগ, কৃষি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সহযোগিতার মতো বিষয়গুলি সামনে এসেছে। ব্রিকস দেশগুলির সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যও ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য জায়গায় পৌঁছেছে। ফলে ব্রিকস ভারতের জন্য শুধু কূটনৈতিক মর্যাদার মঞ্চ নয়— বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খলা বা সাপ্লাই চেইন, বিনিয়োগ এবং বিকল্প অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রও বাড়তি সুবিশার একটা ক্ষেত্র হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পাকিস্তানের অনুপস্থিতি। পাকিস্তান ব্রিকসে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করলেও এখনও সদস্য হতে পারেনি। কারণ নতুন সদস্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বসম্মতির প্রয়োজন, আর ভারত পাকিস্তানের সদস্যপদের বিরোধিতা
করে আসছে।
চিন ও রাশিয়ার সমর্থন থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের প্রবেশ ঘটেনি— যা নিঃসন্দেহে দিল্লির কূটনৈতিক অবস্থানের একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য। তবে এখানেই অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিতে বিপদের সম্ভাবনা আছে। ভারত যদি মনে করে যে ব্রিকসকে ব্যবহার করে চিনকে সম্পূর্ণভাবে নিজের কূটনৈতিক অবস্থানে আনা সম্ভব, তা বাস্তবসম্মত নয়। দিল্লি-শি বৈঠকে সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলেছে ঠিকই, কিন্তু সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্য-ঘাটতি, চিনের পাকিস্তান-নীতি এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখনও অমীমাংসিত। তাছাড়া ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিনের আগ্রাসী নীতির বিষয়েও চিনের সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়নি।
অন্যদিকে নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে বড় শক্তিই আবার তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও বটে। ১৪০ দফায় ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, কিন্তু বহু গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্নে ভাষা ইচ্ছাকৃতভাবে সতর্ক ও অস্পষ্ট। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বিষয়ে ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বিভাজন স্পষ্ট। রাশিয়ার উপস্থিতিতে ঘোষণাপত্রে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আভাষ এলেও কার্যকরীভাবে ব্রিকসের মঞ্চ অপর পক্ষ রাশিয়াকে কিছু বলতে পারেনি। অর্থাৎ সম্মেলনের ঐক্য মানেই কৌশলগত ঐকমত্য নয়। সেই কারণেই হয়ত পরস্পর বিরোধী ইউএই, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইরাণ এই ঘোষণাপত্রে একই সঙ্গে সই করেছে।
তবু ভারতের লাভ অস্বীকার করা যায় না। দিল্লি দেখিয়ে দিয়েছে— একদিকে আমেরিকা ও পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও, অন্যদিকে রাশিয়া, চিন, ইরান, আরব বিশ্ব ও গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে একই টেবিলে বসে ভারত নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। এটাই সম্ভবত ভারতের বর্তমান কৌশলগত সার্বভৌমত্ব বা স্ট্র্যাটেজিক অটোনমির সবচেয়ে বাস্তব পরীক্ষা।
অতএব দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনের সাফল্যকে শুধু শত্রুরা এক টেবিলে বসেছিল বলে বিচার করলে তা অসম্পূর্ণ হবে। আসল সাফল্য হল— শত্রুতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও ভারত এমন একটি মঞ্চ পরিচালনা করেছে যেখানে সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, একমেরু আধিপত্যের পরিবর্তে বহুমেরুতা এবং ক্ষমতার পরিবর্তে স্বার্থের সমীকরণ জায়গা পেয়েছে। এখন ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ একটাই—এই কূটনৈতিক সাফল্যকে বাস্তব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত লাভে পরিণত করা।