মালদহে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গঙ্গার জলস্তর বিপৎসীমার অনেক উপরে উঠে যাওয়ায় জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে। প্রায় তিন লক্ষ মানুষ ইতিমধ্যেই বন্যার কবলে পড়েছেন। বুধবারও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নতুন নতুন এলাকা জলের তলায় চলে যাওয়ার পাশাপাশি বহু মানুষ নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, পানীয় জল এবং চিকিৎসার জন্য প্রশাসনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, গঙ্গার জলস্তর এখনও বাড়ছে। বুধবার দুপুর ২টায় মালদহে গঙ্গার জলস্তর ২৫.৯৯ মিটারে পৌঁছয়, যেখানে চরম বিপদসীমা ২৫.৩০ মিটার। অর্থাৎ জলস্তর বিপদসীমার চেয়েও যথেষ্ট উপরে। সেচ দপ্তরের আধিকারিকদের আশঙ্কা, উজানে জলপ্রবাহ আরও বাড়লে আগামী ২৪ ঘণ্টায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ফলে মানিকচক ঘাট-সহ আশপাশের এলাকায় নতুন করে জল ঢোকার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যরক্ষায়। রতুয়া-১-এর মহানন্দাটোলা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রও নতুন করে বন্যার জলে ডুবে যাওয়া তারই একটি বড় সতর্কসংকেত। যে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বিপদের সময় মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা হওয়ার কথা, সেটিই যদি জলের মধ্যে চলে যায়, তা হলে প্রত্যন্ত এলাকার অসুস্থ মানুষ, অন্তঃসত্ত্বা মহিলা, শিশু ও প্রবীণদের দুর্ভোগ কতটা বাড়তে পারে, তা
সহজেই অনুমেয়।
তবে প্রশাসনের কিছু জরুরি পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসনীয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইতিমধ্যে বন্যাত্রাণে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন৷ বন্যা পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের দল আকাশপথে এলাকা পরিদর্শন করেছে। মানিকচক ও রতুয়ার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা, বিশেষ করে ভূতনি দিয়াড়া ও কাটাহা দিয়াড়ার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয়েছে। এই ধরনের সমীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বন্যার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি না বুঝে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়।
প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, মানিকচক ও রতুয়ার প্রায় ৬০টি গ্রাম বন্যায় আক্রান্ত। বাঁধের একটি অংশ সমতল করে দেওয়ার পরেও জলস্তর কমেনি। ফলে এখন এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না, যার ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। জল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষের নিরাপদ সরিয়ে নেওয়া এবং পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াই এই মুহূর্তে প্রধান কর্তব্য।
বন্যায় ইতিমধ্যেই একজনের মৃত্যু হয়েছে। সাপের কামড়ে একজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, প্রসবযন্ত্রণায় আক্রান্ত এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে পুলিশ গভীর রাতে উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, বন্যার সময় শুধু খাদ্য ও আশ্রয় নয়, জরুরি চিকিৎসা পরিষেবাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর চণ্ডীপুরের ১০ শয্যার স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ইতিমধ্যেই গ্রাম পঞ্চায়েত ভবনের প্রথম তলায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ছয়টি নৌকাকে জল-অ্যাম্বুল্যান্স হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, আশা ও আইসিডিএস কর্মীরা বন্যাকবলিত এলাকায় পরিষেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই ব্যবস্থা আরও বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ এবং গুরুতর অসুস্থদের জন্য আলাদা তালিকা তৈরি করে তাঁদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া উচিত।
মালদহের এই বন্যা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও আন্তঃদপ্তরীয় সমন্বয়েরও পরীক্ষা। সেচ, স্বাস্থ্য, পুলিশ, বিপর্যয় মোকাবিলা, পঞ্চায়েত এবং স্থানীয় প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ত্রাণ পৌঁছনোর ক্ষেত্রে কোনও এলাকা যেন বিচ্ছিন্ন না থাকে, তার জন্য নৌকা ও জলপথকে আরও কার্যকর করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, জল কমার অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। জলস্তর বাড়তে থাকলে আগামী কয়েক ঘণ্টাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখনই পর্যাপ্ত নৌকা, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ওষুধ, সাপের কামড়ের প্রতিষেধক এবং জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা মজুত করতে হবে। একই সঙ্গে বাঁধ ও নদীর গতিপ্রকৃতির উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখতে হবে।
মালদহের বন্যা
বন্যার জল তো নামবেই। কিন্তু সেই জল নামার পরও মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, রাস্তা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জীবিকা পুনর্গঠনের দীর্ঘ কাজ থেকে যাবে। তাই ত্রাণের পাশাপাশি এখন থেকেই পুনর্বাসনের পরিকল্পনাও জরুরি। মালদহের মানুষের এই কঠিন সময়ে প্রশাসনের দ্রুত, স্বচ্ছ এবং মানবিক ভূমিকার কোনও বিকল্প নেই।