নতুন যুদ্ধক্ষেত্র : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

Photo: Magnific

একটা সময় ছিল যখন সাম্রাজ্যবাদের মুখ ছিল বারুদের গন্ধে ভরা। যুদ্ধজাহাজ, কামান, সীমান্ত দখল আর অর্থনৈতিক শোষণ ছিল শক্তির প্রধান ভাষা। তারপর পৃথিবী বদলাল। এল তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। ক্ষমতার কেন্দ্র সরতে সরতে এসে দাঁড়াল তথ্যের ওপর। যে তথ্য নিয়ন্ত্রণ করল, সে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করল; যে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করল, সে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করল। কিন্তু পৃথিবী এখন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। আজ মানুষের শ্রম নয়, তথ্য নয়, বরং মানুষের চিন্তাশক্তিকেই অনুকরণ করতে শিখছে যন্ত্র। এই নতুন পৃথিবীর নাম— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পৃথিবী। এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— ভারত কি নিজের প্রযুক্তিগত ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হবে, নাকি অন্যের তৈরি বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরশীল এক নতুন উপনিবেশে পরিণত হবে?

সম্প্রতি আমেরিকার প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে বিশ্বের অন্যতম উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মাতা একটি সংস্থার কয়েকটি শক্তিশালী প্রযুক্তির বিদেশে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। খবরটি আপাতদৃষ্টিতে প্রযুক্তি জগতের একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত বলে মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর এক সতর্কবার্তা। এতদিন মনে করা হচ্ছিল প্রযুক্তির জগতে সীমানা বলে কিছু নেই, জ্ঞান সর্বজনীন, উদ্ভাবন বিশ্বজনীন। কিন্তু এই ঘটনা দেখিয়ে দিল যে— প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হয়, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ তত কঠোর হয়। যখনই কোনও প্রযুক্তি কৌশলগত শক্তির উৎস হয়ে ওঠে, তখন তা আর মুক্ত বাজারের সম্পদ থাকে না; তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ।

ভারতের মতো একটি দেশ, যার অর্থনীতির বড় অংশ তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর; সেই ভারতের কাছে এই ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বহুদিন ধরেই দেখেছি শিল্পোৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সাফল্য না এলেও তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প দেশের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিয়েছে। লক্ষ লক্ষ তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু আজ সেই শিল্প নিজেই এক বিপ্লবের মুখোমুখি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্রমশ মানুষের কাজ নিজে করতে শিখছে। প্রোগ্রাম লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, সফটওয়্যার পরীক্ষা— বহু ক্ষেত্রেই মানুষের প্রয়োজন কমে আসছে। আগামী পৃথিবীতে যে দেশ এই প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকবে, তার অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি বিশ্বরাজনীতিতেও তার প্রভাব বাড়বে।


এই কারণেই ভারতের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব। আমরা কি চিরকাল বিদেশি প্রযুক্তির ভোক্তা হয়ে থাকব? নাকি নিজের গবেষণা, নিজের তথ্যভাণ্ডার, নিজের বিজ্ঞানী এবং নিজের আইনি কাঠামোকে কেন্দ্র করে এমন এক প্রযুক্তি নির্মাণ করব যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে সম্পূর্ণ আমাদের হাতে? কারণ প্রযুক্তির ওপর বিদেশি নির্ভরতা শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি প্রশাসনিক স্বাধীনতা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদার প্রশ্ন।

সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলতে বোঝায়— এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে একটি দেশ নিজস্ব অবকাঠামো, তথ্যভাণ্ডার, প্রযুক্তিবিদ এবং আইনব্যবস্থার ভিত্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মাণ, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করবে। এর জন্য দরকার অত্যাধুনিক অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গণনাযন্ত্র, বিশাল তথ্যকেন্দ্র, শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার এবং ভাষাভিত্তিক বৃহৎ বুদ্ধিমত্তা মডেল, যেগুলি কোটি-কোটি তথ্য বিশ্লেষণ করে নিজেকে ক্রমাগত উন্নত করতে পারে।

ভারত যে এই পথে হাঁটতে শুরু করেনি, তা নয়। দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি ইতিমধ্যে নিজস্ব সুপারকম্পিউটার নির্মাণ করেছে। দেশীয় ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, বিশ্বে যে প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা চলছে, সেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ আকাশছোঁয়া। উন্নত দেশগুলির সংস্থাগুলি বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। সেখানে ভারতের উদ্যোগ এখনো ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন।

আমাদের বুঝতে হবে— একটি বা দুটি প্রকল্প দিয়ে প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা অর্জন করা যায় না। বহু গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি উদ্যোগকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। একাধিক দেশীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। কারণ প্রতিযোগিতা ছাড়া উৎকর্ষ আসে না। নদী যেমন নিজের স্রোতে শক্তি পায়, তেমনি প্রযুক্তিও বহু সমান্তরাল পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে পরিণত হয়।

কিন্তু প্রযুক্তির থেকেও বড় প্রশ্ন তথ্যের। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাণশক্তি হলো তথ্য। যে দেশের কাছে যত বেশি তথ্য, তার প্রযুক্তি তত বেশি সক্ষম। এখানেই আসে তথ্য-সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। পৃথিবীর বহু দেশ ইতিমধ্যে এমন নীতি গ্রহণ করেছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেশের সীমানার বাইরে রাখা যায় না। ভারতেও সেই ব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি। কারণ ভারতীয় নাগরিকের তথ্য যদি বিদেশি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে প্রযুক্তি ব্যবহার আমরা করব ঠিকই, কিন্তু তার প্রকৃত মালিকানা থাকবে অন্যের হাতে।

এই প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি প্রযুক্তি সংস্থাগুলি ভারতে বিনিয়োগ করছে ঠিকই, কিন্তু বিনিয়োগের সঙ্গে তথ্যের মালিকানার প্রশ্নও জড়িত। যদি ভারতীয় তথ্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তিতে পরিণত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কোনও আন্তর্জাতিক নীতিগত পরিবর্তনের ফলে ভারত হঠাৎ প্রযুক্তিগত সংকটে পড়তে পারে। আজ অন্য দেশে যা ঘটছে, কাল তা আমাদের সঙ্গেও ঘটতে পারে।
আরও একটি বড় বাস্তবতা আছে— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল শক্তি খরচ করে। বিশাল তথ্যকেন্দ্র, গণনাযন্ত্র, গবেষণা অবকাঠামো চালাতে অসংখ্য বিদ্যুৎ দরকার। ফলে প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য শক্তি এবং প্রযুক্তি অবকাঠামোকে একসঙ্গে ভাবতে হবে।

ভারতের ইতিহাস বলছে— বাধা আমাদের থামাতে পারেনি। যখন উন্নত দেশগুলি মহাকাশ প্রযুক্তি দিতে অস্বীকার করেছিল, ভারত নিজেই নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি করেছে। যখন সুপারকম্পিউটার দেওয়া হয়নি, আমরা নিজেরাই তা নির্মাণ করেছি। যখন আন্তর্জাতিক চাপ এসেছিল, তখনও ভারত তার পারমাণবিক কর্মসূচি সফল করেছে। ইতিহাস আমাদের শেখায় যে— বাইরের নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় আত্মনির্ভরতার জন্ম দেয়।

আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও সেই একই মানসিকতা দরকার। আমাদের শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হলে চলবে না। আমাদের এমন এক পরিবেশ গড়তে হবে যেখানে বিশ্বের সেরা গবেষকরা ভারতে কাজ করতে চাইবেন, বিশ্বের সেরা শিক্ষকরা ভারতীয় ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দেবেন এবং ভারত নিজেই নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষাগারে পরিণত হবে কারণ আগামী পৃথিবীতে স্বাধীনতা কেবল সীমান্ত পাহারা দিয়ে রক্ষা করা যাবে না। স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে নিজের তথ্যের ওপর অধিকার রেখে, নিজের প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে, নিজের ভবিষ্যৎকে বিদেশি যন্ত্রের হাতে সমর্পণ না করে।

এই মুহূর্তে পৃথিবী এক নতুন স্বাধীনতা সংগ্রামের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই সংগ্রাম রাজনৈতিক নয়, সামরিক নয়— এটি প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার সংগ্রাম। ভারতকে এই সংগ্রামে শুধু অংশগ্রহণকারী হলে চলবে না; ভারতকে নেতৃত্ব দিতে হবে। কারণ আগামী পৃথিবীর ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সেই দেশই লিখবে, যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভাষা নিজের হাতে লিখতে পারবে।