অসুখের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় শরীরের যন্ত্রণার পাশাপাশি ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়েরও মুখে পড়েন। চিকিৎসার খরচে সঞ্চয় ফুরোয়, গয়না বিক্রি করতে হয় এবং অনেকসময়, জমি বা বাড়ি বন্ধক রাখতে হয়। সন্তানের পড়াশোনা, বিয়ের সঞ্চয় কিংবা ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য রাখা অর্থ চলে যায় হাসপাতালের কাউন্টারে। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চিকিৎসা শেষ হলেও সেই ক্ষত সহজে শুকোয় না। অর্থাৎ অসুখ শুধু শরীরকে আঘাত করে না, তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে গোটা পরিবারের বর্তমান ও ভবিষ্যতে। সেই বিপর্যয়ের সবচেয়ে নির্মম অঙ্কটি অনেক সময় লেখা থাকে ওষুধের গায়ে।
ক্যান্সারের মতো মারণব্যাধির চিকিৎসায় এই বাস্তবতা আরও তীব্র। সম্প্রতি ওষুধের দাম নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের একের পর এক মন্তব্য সেই অস্বস্তিকর সত্যকে ফের সামনে এনে দিয়েছে। একটি ক্যান্সারের ওষুধ খুচরো বিক্রেতার কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৭০০ টাকায়, অথচ
তার সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা এমআরপি ২৭ হাজার টাকা।
অর্থাৎ সরবরাহমূল্য ও মুদ্রিত মূল্যের মধ্যে দশ গুণের ফারাক। ২৯ সেপ্টেম্বর বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ প্রশ্ন তুলেছে, এই বিপুল পার্থক্যের কারণ কী এবং এই অতিরিক্ত অর্থের সুবিধা কে পাচ্ছে। আদালত এই পরিস্থিতিকে ধ্বংসযজ্ঞ (carnage) বলেও মন্তব্য করেছেন।
প্রশ্নটি তাই শুধু একটি ক্যান্সারের ওষুধের দাম নিয়ে নয়। প্রশ্নটি গোটা ওষুধ-বাজারের চরিত্র নিয়ে। জীবন বাঁচানোর জন্য যে পণ্য মানুষের দরকার, তার মূল্য নির্ধারণে বাজারের স্বাধীনতার সীমা কোথায়? একজন রোগী যখন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে ফার্মেসির সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁর দর-কষাকষির ক্ষমতা থাকে না। প্রয়োজনীয় ওষুধটি তাঁকে কিনতেই হবে। সেখানে দামের অস্বাভাবিক ফারাক কেবল অর্থনৈতিক বিষয় থাকে না, হয়ে ওঠে মানবিক প্রশ্ন।
দেশে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০১৩ সালের ড্রাগস প্রাইসেস কন্ট্রোল অর্ডার বা ডিপিসিও রয়েছে। নির্দিষ্ট তালিকাভুক্ত ওষুধের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ মূল্যসীমা কার্যকর। কিন্তু তালিকার বাইরে থাকা বহু ওষুধের মূল্য নির্ধারণে নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলকভাবে কম। মামলাটির আবেদনকারীদের বক্তব্য, বাজারের বিপুল অংশ এই ‘নন-সিডিউলড’ ওষুধের অন্তর্ভুক্ত। ফলে ওষুধের গায়ে লেখা এমআরপি এবং রোগীর হাতে পৌঁছনোর প্রকৃত মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরির সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট এই জায়গাতেই একটি অভিন্ন নীতির সম্ভাবনা নিয়ে কেন্দ্রের কাছে জানতে চেয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ক্ষেত্রে যখন খুচরো বিক্রেতার মার্জিনের একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, তখন অন্যান্য ওষুধের ক্ষেত্রেও এমআরপি নির্ধারণে একই ধরনের সীমা রাখা যাবে না কেন— এই প্রশ্ন তুলেছে বেঞ্চ। আদালত সমস্ত ওষুধের ক্ষেত্রে ১৬ শতাংশের মতো একটি অভিন্ন মার্জিনের সম্ভাবনাও কেন্দ্রকে বিবেচনা করতে বলেছে। তবে এটি এখনও আদালতের প্রশ্ন ও প্রস্তাবের পর্যায়ে; কোনও নতুন সর্বজনীন মূল্যনীতি কার্যকর হয়নি।
এই বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বেসরকারি হাসপাতালের নিজস্ব ফার্মেসির প্রশ্নও। আদালতে অভিযোগ উঠেছে, কিছু কর্পোরেট হাসপাতাল রোগীদের নিজেদের ফার্মেসি থেকেই ওষুধ কিনতে বাধ্য করে। বাইরে থেকে ওষুধ কিনলে চিকিৎসার নিশ্চয়তা নিয়ে সমস্যার কথাও কোথাও-কোথাও বলা হয়।
বিষয়টি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রকে বলেছে আদালত। সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসা হলে অতিরিক্ত ওষুধের দাম শেষ পর্যন্ত সরকারি অর্থ থেকেই মেটানো হতে পারে। অর্থাৎ বোঝাটি এসে পড়ে করদাতার উপরও।
অসুখের বাজারে রোগী সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ। একটি পোশাকের দাম বেশি মনে হলে মানুষ দোকান বদলাতে পারেন। কোনও গৃহস্থালির পণ্যের দাম পছন্দ না হলে কেনা স্থগিত রাখতে পারেন। কিন্তু জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে সেই স্বাধীনতা কোথায়? চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট ওষুধ প্রয়োজন হলে রোগীর সামনে পথ সংকুচিত হয়ে আসে। তখন ওষুধের দাম যতই বাড়ুক, তাকে কিনতে হয়।
সেখানেই চিকিৎসা ও বাণিজ্যের মধ্যে একটি নৈতিক সীমার প্রয়োজন। ওষুধ উৎপাদনে গবেষণা, কাঁচামাল, সংরক্ষণ, পরিবহণ, বিপণন ইত্যাদির খরচ আছে। প্রস্তুতকারক ও বিক্রয়ব্যবস্থার যুক্তিসঙ্গত মুনাফার অধিকারও আছে। কিন্তু সেই মুনাফার অঙ্ক যদি রোগীর অসহায়তার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের নজরদারি জরুরি। বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সবসময় যথেষ্ট হতে পারে না।
কারণ ওষুধের গায়ে লেখা দাম কখনও কেবল একটি সংখ্যা নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোনও বাবার সঞ্চয়, কোনও মায়ের গয়না, কোনও পরিবারের সন্তানের পড়াশোনার টাকা। ক্যান্সারের চিকিৎসার মতো দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল চিকিৎসায় এই চাপ ক্রমশ গভীর হয়। একটি পরিবারের আর্থিক ভিত অসুখের অভিঘাতে ভেঙে পড়লে রোগের সঙ্গে লড়াই আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তাই প্রয়োজন সম্পূর্ণ মূল্যশৃঙ্খলে স্বচ্ছতা। প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে খুচরো বিক্রেতা পর্যন্ত কোন স্তরে কত মূল্য সংযোজিত হচ্ছে, তার স্পষ্ট হিসাব থাকা দরকার। হাসপাতালের ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রেও রোগীর স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নকল ওষুধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা একই সঙ্গে প্রয়োজন। দাম বেশি দিয়ে যদি রোগী নিম্নমানের বা নকল ওষুধ হাতে পান, তবে ক্ষতিটা দ্বিগুণ।
সুপ্রিম কোর্টের এই শুনানি তাই ওষুধের দাম নিয়ে একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। চিকিৎসা কি ধীরে ধীরে শুধু সামর্থ্যবান মানুষের নাগালের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে? নাকি অসুস্থ মানুষের জীবনরক্ষার প্রয়োজনকে বাজারের মুনাফার অঙ্কের আগে স্থান দেবে রাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা? ওষুধের মূল্য নির্ধারণে যুক্তিসঙ্গত সীমা, স্বচ্ছতা এবং রোগীর স্বার্থ—এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য কোথায় দাঁড়াবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আদালত।
অসুখ মানুষের শরীরকে দুর্বল করে। চিকিৎসার অযৌক্তিক ব্যয় যদি তার সংসারের ভিতটিকেও দুর্বল করে দেয়, তবে সেই ব্যথা আরও গভীর। একটি ওষুধ জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে। সেই ওষুধের দাম যেন একটি পরিবারের জীবনযাত্রাটুকু কেড়ে না নেয়— স্বাস্থ্যব্যবস্থার মানবিকতার পরীক্ষা আসলে এখানেই।