সতর্ক থেকেই স্থিতিশীলতার পথে এগোক ভারত-চিন সম্পর্ক

Image: IANS

ভারত ও চিনের সম্পর্ক আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতার দিকে এগোচ্ছে, এমন একটি বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-র সাম্প্রতিক বৈঠকে। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত দুই দেশের বিশেষ প্রতিনিধিদের ২৫তম দফার সীমান্ত-আলোচনায় শুধু সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার কথা নয়, প্রকৃত সীমান্ত নির্ধারণ বা ‘বাউন্ডারি ডিলিমিটেশন’ নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এই অগ্রগতিকে চূড়ান্ত সমাধানের পূর্বাভাস হিসেবে দেখারও কারণ নেই।

২০২০ সালের সীমান্ত-সংঘাতের পর ভারত-চিন সম্পর্ক যে গভীর অবিশ্বাসের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল, তার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি বরাবর সেনা মোতায়েন, পরিকাঠামো নির্মাণ, টহল এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা রয়েছে। ফলে সীমান্তে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোনো— ভারতের কাছে এই দুটি লক্ষ্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক আলোচনায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ‘আর্লি হার্ভেস্ট’ বা সীমান্তের কিছু অংশের বিষয়ে দ্রুত সমঝোতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা। গত বছরের ২৪তম দফার বৈঠকে এই উদ্দেশ্যে একটি বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠী গঠনের কথা হয়েছিল। এবার চিন জানিয়েছে, গত এক বছরে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। যদিও কোন কোন অঞ্চলে এই প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, সে বিষয়ে ভারত বা চিন কেউই বিস্তারিত জানায়নি। এই গোপনীয়তা অস্বাভাবিক নয়। সীমান্তের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আগাম কোনও নির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করলে পরবর্তী আলোচনার পরিসর সংকুচিত হতে পারে।

ভারতের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হল, সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কোনও আপস না করা। কারণ, সীমান্তে শান্তি না থাকলে দুই দেশের মধ্যে বৃহত্তর সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে ২০২৪ সালের অক্টোবরের বৈঠকের পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা এখনও প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। ডোভালের কথাতেও সেই সতর্ক আশার কথা ধরা পড়েছে। তিনি বলেছেন, গত এক বছরে সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতার দিকে ফিরছে।


কিন্তু ‘স্বাভাবিকতা’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, সেটিই আসল প্রশ্ন। ভারতের পক্ষে স্বাভাবিকতা মানে কেবল উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বা কূটনৈতিক সৌজন্য নয়। এর অর্থ সীমান্তে স্থায়ী শান্তি, সেনাবাহিনীর মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি, নিয়মিত যোগাযোগ, বাণিজ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বাস্তব সহযোগিতার পুনরুজ্জীবন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) নিয়ে স্পষ্টতা বৃদ্ধি। ২০২০ সালের অভিজ্ঞতার পরে ভারত আর এমন কোনও পরিস্থিতি চাইবে না, যেখানে সীমান্তে আকস্মিক উত্তেজনা তৈরি হয়ে পুরো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আবার পিছিয়ে যায়।

এই কারণেই চিনা কৌশলগত বিশেষজ্ঞ হু শিহশেং-এর মন্তব্যটিও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, এই মুহূর্তে নাটকীয় সীমান্ত-সমাধানের চেয়ে ‘স্থিতিশীলতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকেও কথাটি যথেষ্ট বাস্তবসম্মত। সীমান্ত সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান অত্যন্ত কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। কিন্তু তার আগে সীমান্তে ভুল বোঝাবুঝি, ভুল হিসাব এবং আকস্মিক সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমানো সম্ভব। সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, নিয়মিত বৈঠক চালু রাখা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা সেই কাজেরই অংশ।

তবে ভারতের উচিত হবে না শুধু চিনের আশ্বাসের উপর নির্ভর করা। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার জন্য কথাবার্তার পাশাপাশি মাটিতে বাস্তব পরিস্থিতিরও নজরদারি জরুরি। সীমান্তে পরিকাঠামো উন্নয়ন, সেনার প্রস্তুতি এবং নজরদারি ব্যবস্থা ভারতকে অব্যাহত রাখতে হবে। শান্তি প্রতিষ্ঠার অর্থ কখনোই নিরাপত্তা প্রস্তুতি কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং সক্রিয় কূটনীতি— দুটিকে পাশাপাশি চালিয়েই ভারত চিনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আসন্ন ব্রিকস সম্মেলন। দিল্লিতে সেপ্টেম্বরের বৈঠকে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপস্থিতির সম্ভাবনা ভারত-চিন সম্পর্ককে নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব দিয়েছে। দুই দেশের নেতাদের মধ্যে বৈঠক হলে সীমান্তের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়েও আলোচনা হতে পারে। ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত, সীমান্তে কোনও অপ্রত্যাশিত ঘটনা যাতে সেই রাজনৈতিক পরিবেশকে নষ্ট না করে।

তবে এখানেও ভারতের বাস্তববাদী থাকা প্রয়োজন। ভারত ও চিনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি। এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, ভারত মহাসাগর এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থের পার্থক্য রয়েছে। চিন যেমন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী, তেমনই নিজের কৌশলগত অবস্থানও ধরে রাখতে চাইবে। তাই বর্তমান প্রক্রিয়াকে বন্ধুত্বের প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতার মধ্যে স্থিতিশীল সহাবস্থানের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত।

ভারতের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এই সমীকরণে একটি ভূমিকা রাখছে। আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কিছু ক্ষেত্রে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় দিল্লির কাছে কৌশলগত বিকল্পগুলি বহুমুখী রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সময়ে চিনও আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের চাপ কিছুটা সামলে নিয়ে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে আগ্রহী হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ভারত তার কৌশলগত স্বাধীনতা বিসর্জন দেবে। বরং ভারতের স্বার্থেই প্রয়োজন—আমেরিকা, রাশিয়া, ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং চিন— সব পক্ষের সঙ্গে নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক বজায় রাখা।

ভারত-চিন সীমান্ত সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার মধ্যে আলোচনার পথ খোলা থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্রয়োজন কথার সঙ্গে কাজের মিল। সীমান্তে শান্তি, সামরিক যোগাযোগ, ‘আর্লি হার্ভেস্ট’-এর বাস্তব অগ্রগতি এবং প্রকৃত সীমান্ত নির্ধারণের দিকে ধাপে ধাপে এগোনো— এই চারটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে তবেই স্বাভাবিকতার দাবি বিশ্বাসযোগ্য হবে।

ভারতের উচিত তাই আশাবাদী হওয়া, কিন্তু আত্মতুষ্ট না হওয়া। চিনের সঙ্গে সংঘাত নয়, স্থিতিশীল সম্পর্ক তৈরি করা দরকার ভারতের স্বার্থে। একই সঙ্গে সীমান্তের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনও অস্পষ্টতা চলবে না। শান্তি চাই, কিন্তু শক্তির অবস্থান থেকে; সংলাপ চাই, কিন্তু সতর্কতার সঙ্গে; সহযোগিতা চাই, কিন্তু জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে। ভারত-চিন সম্পর্কের আগামী অধ্যায়ের জন্য সম্ভবত এই ভারসাম্যই হবে সবচেয়ে কার্যকর নীতি।