কর্মসংস্থানই হোক পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের মূল ভিত্তি

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ক্রমশ আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে—রাজ্যের উন্নয়নের জন্য সরকার কি মূলত বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের উপর নির্ভর করবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আবেগের পরিবর্তে বাস্তব অর্থনীতি, সামাজিক প্রয়োজন এবং উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি দর্শনকে সামনে রাখতে হবে।

গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প চালু হয়েছে। নারীদের জন্য আর্থিক সহায়তা, ছাত্রছাত্রীদের জন্য বৃত্তি, বার্ধক্য ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কৃষকদের জন্য সহায়তা এবং অন্যান্য কল্যাণমূলক কর্মসূচি সাধারণ মানুষের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এই প্রকল্পগুলির গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। সামাজিক নিরাপত্তা একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব এবং সেই দায়িত্ব থেকে সরকার সরে যেতে পারে না।

কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, কোনও রাজ্যের অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধুমাত্র ভাতাভিত্তিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ভাতা মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা তৈরি করতে পারে না। একজন যুবক বা যুবতী যদি কর্মসংস্থানের সুযোগ না পান, তবে মাসিক কিছু আর্থিক সহায়তা তাঁর জীবনযাত্রার মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। বরং একটি সম্মানজনক চাকরি বা স্বনিযুক্তির সুযোগ তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করতে পারে।


বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল বেকারত্ব। প্রতিবছর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে বহু যুবক-যুবতী বাধ্য হয়ে রাজ্যের বাইরে কাজের সন্ধানে যাচ্ছেন। দিল্লি, বেঙ্গালুরু, পুনে, হায়দরাবাদ, চেন্নাই কিংবা গুজরাটের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক, প্রযুক্তিবিদ ও শিক্ষিত যুবকদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; বরং রাজ্যের মানবসম্পদের এক প্রকার বহিঃপ্রবাহ।

একটি রাজ্যের প্রকৃত শক্তি তার মানবসম্পদ। যদি সেই মানবসম্পদ অন্যত্র চলে যায়, তবে রাজ্যের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের জন্য নতুন শিল্প স্থাপন, বিনিয়োগ এবং উদ্যোক্তার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিল্পায়ন ছাড়া বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়। এক সময় পশ্চিমবঙ্গ ছিল দেশের অন্যতম শিল্পোন্নত রাজ্য। কিন্তু নানা ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে সেই অবস্থান অনেকাংশে হারিয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে সেই হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

শুধু বড় শিল্প নয়, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের বিকাশও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, মৎস্যচাষ, পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া শিল্প, বস্ত্রশিল্প এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার যদি অবকাঠামো উন্নয়ন, সহজ ঋণপ্রাপ্তি, বাজার সংযোগ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে এই খাতগুলিকে শক্তিশালী করে, তবে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কৃষিক্ষেত্রেও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ কৃষিপ্রধান রাজ্য হলেও কৃষকদের আয় এখনও অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত। কৃষির সঙ্গে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, কোল্ড স্টোরেজ, কৃষিপণ্য বিপণন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। গ্রাম থেকে শহরে শ্রমশক্তির অপ্রয়োজনীয় স্থানান্তরও অনেকাংশে কমবে।
একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিতে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল পরিষেবা অন্যতম চালিকাশক্তি। কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বিস্তারের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ, তুলনামূলক কম জীবনযাত্রার ব্যয় এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা পশ্চিমবঙ্গকে এই ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে যুবসমাজকে আধুনিক কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে তুলতে হবে।

তবে কর্মসংস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলির প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা উচিত নয়। প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বিধবা নারী, গুরুতর অসুস্থ মানুষ এবং সমাজের অন্যান্য দুর্বল অংশের জন্য সরকারি সহায়তা অপরিহার্য। একটি মানবিক সমাজ কখনও তাদের সহায়তা থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। তাই সব ধরনের ভাতা বন্ধ করে দেওয়ার দাবি বাস্তবসম্মত নয় এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রকৃতপক্ষে, প্রশ্নটি ভাতা বনাম কর্মসংস্থানের নয়। প্রশ্নটি হল উন্নয়নের অগ্রাধিকার কী হবে। সামাজিক সুরক্ষা থাকবে, কিন্তু তার পাশাপাশি এবং তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। ভাতা মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে; কিন্তু কর্মসংস্থান মানুষকে আত্মবিশ্বাস, মর্যাদা এবং স্থায়ী আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করে। ভাতা সরকারের উপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে পারে, কিন্তু কর্মসংস্থান মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলে।

আজ পশ্চিমবঙ্গের সামনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক রোডম্যাপ, যেখানে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, কৃষির আধুনিকীকরণ এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। রাজ্যের যুবসমাজ কাজ চায়, সুযোগ চায় এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণের ক্ষেত্র চায়। তাদের ভবিষ্যৎ শুধু সরকারি সহায়তার উপর নির্ভরশীল হতে পারে না।
পশ্চিমবঙ্গের আগামী দিনের উন্নয়ন নির্ভর করবে কতজন মানুষ ভাতা পাচ্ছেন তার উপর নয়, বরং কতজন মানুষ মর্যাদার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন তার উপর। আত্মনির্ভর ও সমৃদ্ধ পশ্চিমবঙ্গ গড়ে তুলতে হলে কর্মসংস্থানকেই উন্নয়নের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি রাজ্যের প্রকৃত সম্পদ তার জনগণের শ্রম, দক্ষতা এবং সৃজনশীলতা— ভাতা নয়, কর্মই পারে সেই শক্তিকে বিকশিত করতে।