বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক অনুমান অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কোভিড-১৯-এর সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২১ লক্ষ। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়— এটি আমাদের সময়ের এক গভীর ব্যর্থতার দলিল। কারণ এই মৃত্যুগুলির সবই সরাসরি ভাইরাসে সংক্রমণের ফলে হয়নি; বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন চিকিৎসা পরিষেবা ভেঙে পড়া, দেরিতে চিকিৎসা পাওয়া, অথবা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অপ্রস্তুতির কারণে।
কোভিড মহামারি আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে— বিশ্বের উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল, প্রায় সব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিতরেই গভীর দুর্বলতা রয়েছে। হাসপাতালের শয্যা কম, জরুরি পরিষেবার অভাব, ওষুধ সরবরাহে বিশৃঙ্খলা, এবং দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পরিকল্পনার অভাব— সব মিলিয়ে এই ব্যবস্থাগুলি নিয়মিত চাহিদা মেটাতে পারলেও দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় সামলাতে ব্যর্থ হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে— এ ধরনের মহামারি ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন হতে পারে। বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ এবং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে বাড়তে থাকা সংযোগ— এই সব কারণ একত্রে নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অবৈধ বন্যপ্রাণী ব্যবসা এবং জীবন্ত প্রাণীর বাজারও সংক্রমণ ছড়ানোর অন্যতম বড় উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে মহামারি প্রতিরোধ শুধুমাত্র টিকা বা হাসপাতাল বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এর সঙ্গে জড়িত পরিবেশ রক্ষা, বন্যপ্রাণী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈজ্ঞানিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ভারতের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ২০২১ সালের দ্বিতীয় ঢেউয়ে আমরা দেখেছি অক্সিজেনের অভাব, আইসিইউ শয্যার সংকট, ওষুধের ঘাটতি এবং চিকিৎসাকর্মীদের উপর অসম্ভব চাপ। অনেক হাসপাতাল কার্যত ভেঙে পড়েছিল। একই সঙ্গে, মৃত্যুর তথ্য নিয়ে অস্পষ্টতা এবং বিলম্ব মানুষের মধ্যে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
এর আগেই ২০২০ সালের লকডাউন দেশজুড়ে এক বিশাল মানবিক সংকট তৈরি করেছিল।
কোটি কোটি পরিযায়ী শ্রমিক কাজ, বাসস্থান ও খাদ্যের অভাবে পথে নেমে পড়েন। বহু মানুষ শত শত কিলোমিটার হেঁটে নিজেদের গ্রামে ফিরতে বাধ্য হন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার রিপোর্টে উঠে এসেছে— এই সময়ে অসংখ্য শ্রমিক সংক্রমণের কারণে নয়, বরং অনাহার, ক্লান্তি এবং চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, জনস্বাস্থ্য রক্ষার পরিকল্পনায় যদি শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত না হয়, তবে সেই পরিকল্পনা কখনই সফল হতে পারে না।
কোভিডের পরে ভারত কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। জিনোমিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু তবুও বড় ফাঁক রয়ে গেছে। জনস্বাস্থ্য খাতে ব্যয় এখনও অপর্যাপ্ত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা সর্বত্র সমান নয়, এবং রোগ সংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বিশ্বজুড়েও একই ছবি। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য অর্জনের গতি কমে গেছে, এবং স্বাস্থ্যখাতে অর্থায়ন এখনও অস্থির। অথচ মহামারি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন স্থায়ী বিনিয়োগ— হাসপাতাল, গবেষণা, প্রশিক্ষিত কর্মী, এবং পরিবেশগত নজরদারির ক্ষেত্রে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, অধিকাংশ সরকার এখনও মহামারিকে একটি অস্থায়ী জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে দেখে। সংকট এলেই তৎপরতা, তারপর আবার শিথিলতা— এই চক্র চলতেই থাকে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, পরবর্তী মহামারি কোনো দূরবর্তী সম্ভাবনা নয়; এটি সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
এই প্রেক্ষিতে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। জনস্বাস্থ্য মানে শুধু হাসপাতাল নয়— এটি অর্থনীতি, পরিবেশ, শ্রমনীতি এবং সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যদি আমরা এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ না করি, তবে পরবর্তী মহামারির ধাক্কা আরও ভয়াবহ হতে পারে।
অতএব প্রশ্নটি খুবই সরল কিন্তু জরুরি— আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত? বর্তমান বাস্তবতা বলছে, উত্তর এখনও সন্তোষজনক নয়। প্রস্তুতি নিতে হলে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। নইলে ভবিষ্যতের সংকট আমাদের আবারও অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরবে, আর সেই মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।