লেবানন যুদ্ধবিরতি

পশ্চিম এশিয়ার অস্থির রাজনীতিতে যুদ্ধবিরতির খবর সব সময়ই স্বস্তির। ইজরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিও সেই অর্থে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘর্ষ, বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করেছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই যুদ্ধবিরতি কতটা স্থায়ী? নাকি এটি শুধুই বৃহত্তর কূটনৈতিক লক্ষ্য পূরণের একটি অস্থায়ী পদক্ষেপ?
স্পষ্টতই, এই চুক্তির পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৃহত্তর কৌশল রয়েছে। ইরানের সঙ্গে চলমান টানাপোড়েন এবং সম্ভাব্য চুক্তির পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য ওয়াশিংটন চাইছে আঞ্চলিক সংঘর্ষগুলি সাময়িকভাবে হলেও প্রশমিত হোক। লেবাননের পরিস্থিতি শান্ত না হলে ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগোনো কঠিন— এই বাস্তবতা থেকেই মার্কিন প্রশাসনের তৎপরতা।
কিন্তু সমস্যার মূল জায়গাটি রয়ে গিয়েছে অমীমাংসিত। লেবাননের মাটিতে যে সংঘর্ষ চলছে, তা মূলত ইজরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে। অথচ যুদ্ধবিরতির আলোচনায় হিজবুল্লাহ সরাসরি অংশ নেয়নি। ফলে যে চুক্তি তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একতরফাভাবে হিজবুল্লাহর উপর আক্রমণ বন্ধের চাপ তৈরি হলেও ইজরায়েলের ক্ষেত্রে তেমন কোনও বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট নয়। এই অসমতা চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
এর সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িয়ে রয়েছে— দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক উপস্থিতি। হিজবুল্লাহ ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, ইজরায়েল যদি তাদের দখলদারি শেষ না করে, তবে স্থায়ীভাবে সংঘর্ষ থামানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে, ইজরায়েল এখনো সেই দিক থেকে কোনও স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। অতীত অভিজ্ঞতাও খুব আশাব্যঞ্জক নয়; একাধিকবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও তা ভেঙে পড়েছে, বিশেষ করে গাজা উপত্যকার ক্ষেত্রে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের কূটনৈতিক উদ্যোগ অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সরাসরি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেছেন, এমনকি কঠোর ভাষায় চাপ সৃষ্টি করেছেন বলেও খবর। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করেছেন। এই সক্রিয় ভূমিকায় মনে হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে কূটনৈতিক সমাধানকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবুও বাস্তবতা হল, কেবল ঘোষণার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয় না। একটি কার্যকর ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট শর্ত, পারস্পরিক আস্থা এবং বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি। এক পক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করে অন্য পক্ষকে ছাড় দেওয়া হলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
এখানেই এই চুক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। এটি মূল সমস্যাগুলিকে স্পর্শ করেনি— না ইজরায়েলের সামরিক উপস্থিতি, না হিজবুল্লাহর ভূমিকা, না লেবাননের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। ফলে এটিকে একটি ‘স্টপ-গ্যাপ’ বা অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বলাই যুক্তিযুক্ত।
পশ্চিম এশিয়ার শান্তি কোনও একদিনে আসবে না। এর জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ। লেবাননের ক্ষেত্রে স্থায়ী সমাধান চাইলে ইজরায়েলকে দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে এবং সব পক্ষকে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অতএব, এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানানো হলেও, এর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। এটি যদি বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হয়, তবে সেটিকে সফল করতে হলে এখনই আরও দৃঢ় ও সুষম কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। নইলে এই সাময়িক শান্তি আবার অস্থিরতার অন্ধকারে হারিয়ে যেতে পারে।