‘নেশা মুক্ত যুব ফর বিকশিত ভারত সংকল্প অভিযান’-এর সূচনা

Image: IANS

ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার যুবসমাজের উপর, এই কথাটি আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু সেই যুবসমাজ যদি মাদকাসক্তির মতো ধ্বংসাত্মক অভ্যাসের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে একটি উন্নত দেশ গড়ার স্বপ্ন স্বাভাবিকভাবেই বাধাগ্রস্ত হয়। এই প্রেক্ষাপটে ‘নেশা মুক্ত যুব ফর বিকশিত ভারত সংকল্প অভিযান’-এর সূচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা শুধু মাদকবিরোধী প্রচার নয়, বরং সমাজকে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেওয়ার প্রচেষ্টা।
এই উদ্যোগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বার্তাটি উঠে এসেছে, তা হলো—মাদকাসক্তদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সাধারণত আমরা নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে অবজ্ঞা করি বা দূরে সরিয়ে রাখি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা অসুস্থতার শিকার এবং তাদের প্রয়োজন সহানুভূতি, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর যুবসমাজের উদ্দেশে এক ভাষণে স্ষ্টপভাবে বলেছেন, যারা মাদকাসক্তি থেকে ফিরে আসতে লড়াই করে, তারা দুর্বল নয়— বরং প্রকৃত যোদ্ধা। এই দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
মাদকাসক্তির সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি পারিবারিক ও সামাজিক সংকটও তৈরি করে। একজন তরুণ যখন নেশায় জড়িয়ে পড়ে, তখন তার ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, তেমনি তার পরিবারের ওপরও মানসিক চাপ তৈরি হয়। বাবা-মা প্রতিদিন সন্তানের অবক্ষয় দেখতে বাধ্য হন। তাই এই সমস্যার মোকাবিলায় পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী মোদী অভিভাবকদের তাঁদের সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার যে পরামর্শ দিয়েছেন— তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক সময় সামাজিক লজ্জা বা সম্মানের ভয়ে পরিবার বিষয়টি লুকিয়ে রাখে। কিন্তু এতে সমস্যা আরও বাড়ে। বরং শুরুতেই লক্ষণগুলি বুঝে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক, কাউন্সেলর বা পুনর্বাসন কেন্দ্রের সাহায্য নেওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, লুকিয়ে রাখা নয়, বরং সঠিক সময়ে সাহায্য চাওয়াই সমস্যার সমাধানের প্রথম ধাপ।
এই প্রসঙ্গে পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলির গুরুত্বও অনস্বীকার্য। শুধুমাত্র মাদক ছাড়ানোই নয়, একজন ব্যক্তিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে মানসিক সহায়তা, পরামর্শ এবং সামাজিক পুনঃস্থাপন অত্যন্ত প্রয়োজন। সরকার যদি এই ধরনের কেন্দ্রগুলির সংখ্যা ও মান বাড়াতে পারে, তাহলে অনেক তরুণ নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পাবে।
মাদক সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রভাব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উল্লেখ করেছেন যে, শত্রু দেশগুলি মাদক সরবরাহকে কখনও কখনও ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে তারা একদিকে অর্থ উপার্জন করে, অন্যদিকে একটি দেশের যুবসমাজকে দুর্বল করে দেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মাদকবিরোধী লড়াই শুধু সামাজিক বা স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।
তবে শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়। যদিও মাদক জব্দ ও অপরাধীদের গ্রেফতার বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক দিক, তবুও এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ। এই ক্ষেত্রেই ‘নেশা মুক্ত যুব’ অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
এই অভিযানের ১০০ সপ্তাহের পরিকল্পনা, যেখানে প্রতি রবিবার বিভিন্ন কার্যক্রম— যেমন শিল্প, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও ধ্যান— আয়োজিত হবে, তা যুবসমাজকে ইতিবাচক কাজে যুক্ত করতে সাহায্য করবে। তরুণদের শক্তিকে যদি সঠিক পথে পরিচালিত করা যায়, তাহলে তারা সহজেই নেশার মতো ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে পারবে।
এছাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল ও কলেজগুলোতে নিয়মিত সচেতনতা কর্মসূচি, আলোচনা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। তরুণদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, মানসিক শক্তি এবং সঠিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে পারলেই তারা সহজে ভুল পথে পা বাড়াবে না।
সবশেষে বলা যায়, নেশামুক্ত সমাজ গড়ে তোলা একটি সম্মিলিত দায়িত্ব।

সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ— সবার সমন্বিত প্রচেষ্টাই এই লড়াইকে সফল করতে পারে। মাদকাসক্তিকে ঘৃণা করা নয়, বরং মানুষটিকে ভালোবাসা এবং তাকে সঠিক পথে ফেরানোই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।একটি উন্নত ভারতের স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন দেশের যুবসমাজ হবে সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী এবং নেশামুক্ত। তাই আজই সময়— সচেতন হওয়ার, এগিয়ে আসার এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার করার।