নোটন কর
আন্দোলন মানে ঐক্য। গণ ঐক্য। সংগঠনসমূহের ঐক্য। বাংলা ভাষা স্বাধিকারের দাবিতে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন ছিল পূর্ব বাংলার বাঙালি জাতির ঐক্যবদ্ধ এক গণ-আন্দোলন। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকে ১৯৭১ সালে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় একটি নতুন দেশ যার নাম বাংলাদেশ। পূর্ব বাংলায় ভাষা আন্দোলন শুরু হয় যখন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা ঘোষণা করে। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন ছিল তার চূড়ান্ত পরিণতি। বাস্তিল দিবসে ফরাসি জাতি শত শত বছরের গ্লানি মুছে যেমন লাভ করেছিল নবজন্ম, তেমনি ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাঙালি খুঁজে পেয়েছিল তার আত্মপরিচয়ের নতুন ঠিকানা।
ইতিহাস বলছে ভারতীয়দের দুর্দিনের সূচনা হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। ভারতে দু’শো বছরের উপর ব্রিটিশ শাসনকাল বাংলায় বাঙালির আত্মপরিচয়কে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যায় ধর্মের ভিত্তিতে দুটি দেশ ভারত ও পাকিস্তান নামে ভাগাভাগি করে। কিন্তু শুরুতেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকবর্গের কাছে উপেক্ষার শিকার হয়, বিশেষ করে বাংলাভাষার প্রশ্নে।
বরকত, সালাম, জব্বার, রফিকউদ্দিন, শফিউর রহমান-সহ শহীদদের রক্তে ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির মনে এক সংগ্রামী চেতনা ও ঐক্যের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীকালে সব আন্দোলনের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা জোগায়। প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘শহিদ ও ভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। আমাদের এ বাংলাতেও দিনটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে ভাষা আন্দোলন শুধু একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল না, তা ছিল বাংলাদেশের বাঙালির আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সোপান।
ভাষা আন্দোলন ছিল অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের পর, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকেই তখনকার পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি সামনে আসে, যা তখনকার রাজনীতিকেও প্রভাবিত করে। এর কারণ ছিল পূর্ব বাংলার জনগণের অর্জিত সম্পদের একটি বড় অংশ পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বিনিয়োগ করা।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ‘ইউনেস্কো’ একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্যের খাতিরে আমাদের এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল বাংলার মানভূমে ১৯১২ সালে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে ভাষা আন্দোলন তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ে মানভূমের বাঙালিদের মধ্যে। ১৯৫৬ সালের আগে পুরুলিয়া জেলা ছিল বিহারের অন্তর্ভুক্ত। সেইসময় রাজনৈতিকভাবে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল পুরুলিয়ার স্কুল-কলেজ-সরকারি দপ্তরে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তার বিরুদ্ধে এক বৃহৎ আন্দোলন গড়ে ওঠে৷ তখন ভারত সরকার ১৯৫৬ সালে মানভূম জেলা ভেঙে পুরুলিয়াকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করতে বাধ্য হয়।
এই প্রসঙ্গে আসামের ভাষা আন্দোলনের কথাকে ভুলে গেলে চলবে না। আসামের বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল আসাম সরকারের অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যের প্রধান ভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। বরাক অঞ্চলের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বাংলাভাষী। ১৯৬১ সালে ১৯ মে ভাষা আন্দোলনের সময় আসাম পুলিশ ১১ জন প্রতিবাদকারীকে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে গুলি করে হত্যা করে, যার মধ্যে একজন ছিলেন নিতান্ত তরুণী— কমলা ভট্টাচার্য। প্রথম নারী ভাষা শহিদ এবং তা বাংলা ভাষার জন্য।
ভাষা আন্দোলন অতিক্রান্ত হয়েছে অর্ধশতাব্দীরও অধিক কাল। অর্ধশতাব্দী পর বাংলা ভাষার অবস্থা এখন দুই বাংলায় বিশেষকরে পশ্চিম বাংলায় কেমন? সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনে আমরা কতটা এগিয়েছি? শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলা ভাষার অবস্থা কী? প্রশ্নগুলো এখন আমাদের সবার।
স্পষ্ট করে বললে বলতেই হয়, আমাদের পশ্চিম বাংলায় ভাষার অবস্থা এখন অনেকটা স্বদেশে পরবাসীর মতো। এ রাজ্যে এখন উচ্চশিক্ষায় বাংলাভাষা অপাঙক্তেয়। বেসরকারি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষায় কথা বলা কিংবা পরীক্ষার উত্তরপত্র লেখা মহাপাপ।
অতীতে উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষা, বাংলার ব্যবহার ছিল প্রায় সর্বত্র। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (প্রতিষ্ঠা ১৮৫৭), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (প্রতিষ্ঠা ১৯২১) প্রভৃতি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষায় পঠন-পাঠনের ব্যাপক সুযোগ ছিল, কিন্তু আজ আর নেই। কিন্তু কেন? দিনে দিনে বাংলাভাষা কি দুর্বল হচ্ছে? তথাকথিত পণ্ডিতরা বলে থাকেন— উচ্চশিক্ষা, বিশেষত বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষা বাংলা ভাষায় চলতে পারে না। তাঁদের উদ্দেশে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কথা আমরা উল্লেখ করতে পারি। বিজ্ঞানী বসু লিখেছেন— ‘যাঁরা বিজ্ঞানের কথা বাংলায় লেখা যায় না বলে থাকেন, তাঁরা হয় বিজ্ঞান বোঝেন না, নয়তো বাংলা জানেন না।’ মেঘনাদ সাহা, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, সত্যেন বসু প্রমুখ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক অনেক বই লিখে গিয়েছেন এবং এখনও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বাংলা বই ও গবেষণা পত্র লেখা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের জন্ম বাংলাদেশের মতো কোনও রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে হয়নি। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। পশ্চিমবঙ্গের ভাষা বাংলা হলেও হিন্দির আগ্রাসনে সেখানে বাংলাভাষা প্রতিমুহূর্তে অবহেলার শিকার হচ্ছে! সেই সঙ্গে ইংরেজি তো রয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-সহ বিভিন্ন দিবসে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চর্চার কথা বলা হলেও সেটার কার্যকারিতা প্রায় নেই।
ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতে প্রশাসনিক কাজ মাতৃভাষায় হলেও পশ্চিমবঙ্গে তা হয় না। হিন্দি আর ইংরেজিতে চলে সব প্রশাসনিক কার্যক্রম, যার ফলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বাংলা ভাষার। তবে কি বিলুপ্ত হয়ে যাবে বাংলাভাষা পশ্চিমবাংলা থেকেই? এই প্রশ্নটি এখন সব থেকে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলা ভাষার জন্য বাংলাদেশের মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। যে ভাষার জন্য এত আত্মবলিদান, সেই ভাষাকে অবহেলা করে কেন হিন্দি ও ইংরেজি ভাষার চর্চা করা হচ্ছে? এখন যেভাবে চলছে এভাবে চলতে থাকলে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা নিকট ভবিষ্যতে বিপন্নতার মুখে পড়বে। আশ্চর্যজনকভাবে পূর্ব বাংলার বাঙালিরা যে ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তৈরি করল উর্দু সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটা স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জন্ম নিল অধুনা বাংলাদেশ, তেমন ভাষা আন্দোলনের ছিটেফোঁটাও এ বঙ্গের বাঙালির মধ্যে এই হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দেখা যায় না। এমনকী, দক্ষিণের রাজ্যগুলি হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে সক্রিয়তা দেখায়, তার লেশমাত্রও এখানে নেই। বরং বাঙালি মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মধ্যে দেখা যায়— ‘আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না’-মার্কা আদিখ্যেতা।
পুঁজিবাদ শুধু পণ্যনির্ভর নয়, ভাষানির্ভরও। বড় পুঁজির যারা কারবার করে, তাদের ভাষাও যে আধিপত্য বিস্তার করবে এটা পুঁজিবাদের ধর্ম। পণ্যায়ণ মানুষকে নীতি, ভাষা ও সংস্কৃতিহীন করে তোলে। ক্রমশ ভোক্তাকে সাংস্কৃতিক শেকড়হীন করে তোলার ভেতর বাণিজ্য বিস্তারের রাজনীতি আছে। ‘বিশ্বায়ন’ এই ব্যবস্থার প্রকল্প। অন্যান্য ব্যবসার মতোই তারা ভাষা ও শিক্ষা ব্যবসায় নিয়েছে লাভজনক পরিকল্পনা। আর সেজন্য বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সরকারি মদতে কর্পোরেট স্বার্থবাহী ইংরেজি ও হিন্দির জগাখিচুড়ি প্রসার ঘটিয়ে প্রাদেশিক মাতৃভাষাগুলিকে বিপন্ন করে তুলেছে। সরকারি স্কুলগুলিকে উঠিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলেছে। বর্তমান কেন্দ্র সরকার পুঁজির স্বার্থে হিন্দি ও হিন্দুত্বের প্রসার ও আধিপত্য চায়। সেই জায়গা থেকে আজ বাংলাভাষীদের উপর, বাংলার মনীষীদের উপর, তার সংস্কৃতির উপর তীব্র আক্রমণ নামিয়ে এনেছে।
পুঁজিবাদ প্রকৃতপক্ষে মাতৃভাষার বন্ধু হতে পারে না, ইংরেজিকেই তারা বিশ্বায়নের ভাষা নামে চালিয়ে দিতে চাইছে। বিশ্বায়নের যুগে কোনও ভাষার জোর কম না বেশি, তা স্থির করা হয় সেই ভাষায় কাজের সুযোগ বা আরও স্পষ্ট করে বললে রোজগারের সুযোগ কম না বেশি তার দ্বারা— অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সেই ভাষার অংশগ্রহণের অনুপাতের ভিত্তিতে। বর্তমান বাংলাদেশেও সামাজিক ক্ষেত্রে ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও ঐতিহ্য ভীষণরকম দুর্বল হচ্ছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বেসরকারি পুঁজির বিনিয়োগ বাংলা ভাষাকে বিপন্ন করে তুলছে। বাংলাদেশের মৌলবাদীরা ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য ভুলিয়ে দিতে চায় এবং বাংলাদেশে পূর্বেকার পাকিস্তানি ইসলামি সংস্কৃতি ও উর্দু ভাষা ফিরিয়ে আনতে চায়।
ফলত মাতৃভাষা রক্ষার জন্য আবার এক লড়াই দুই বাংলায় সার্বিকভাবে নতুন করে শুরু করতে হবে। এ কথা শুধু বাংলাভাষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বহুভাষিক দেশে সমস্ত জাতি, জনজাতি সবার মাতৃভাষা রক্ষার ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য। কোনও ভাষা যেন অন্যভাষার উপর আধিপত্যকারী না হয়ে উঠতে পারে। আধিপত্যকারী ভাষা পুঁজিবাদী স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। ফলত এই লড়াই আবার পুঁজিবাদের বিরুদ্ধেও। সমস্ত ভাষার মেহনতি ও প্রান্তিক মানুষেরাই বিশেষত মাতৃভাষায় কথা বলে, ভাষাকে রক্ষা করে এবং তার সংস্কৃতিকে রক্ষা করে। তাই ভাষা রক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে হবে এই মানুষদেরই। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আজকের প্রজন্মের কাছে আমাদের বারে বারে পৌঁছে দিতে হবে আগামীর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য।