ভাষা, স্মৃতি ও নাগরিক দায়

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

উজ্জ্বলকুমার দত্ত

ফেব্রুয়ারি এলেই ভাষা সংগ্রামের স্মৃতি নাড়া দেয় যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এই স্মৃতি শ্রদ্ধার ও দায়ের। আমরা ফুল দিই, গান গাই, শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে নীরব হই; কিন্তু তাতেই ভাষার ঋণ শোধ হয় না। কারণ ভাষা কেবল আবেগের বিষয় নয়। ভাষাই মানুষের নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলে। সমাজে তার মর্যাদার জায়গা নির্ধারণ করে ও নাগরিক হিসেবে তার অধিকারকে অর্থ দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারি সেই সত্যটাই স্মরণ করিয়ে দেয়—এই ভাষা কোনোদিন অনায়াসে পাওয়া যায়নি; তাকে ইতিহাসে লিখতে হয়েছে রক্ত দিয়ে।

১৯৫২ সালের ঢাকার রাজপথে যে রক্ত ঝরেছিল, তা কোনও একটি রাষ্ট্রের সীমানায় আবদ্ধ ছিল না। সেই রক্তের অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের বাঙালির মননেও। কারণ ভাষা কেবল কথাবার্তার মাধ্যম নয়— ভাষা স্মৃতি বহন করে, ইতিহাস নির্মাণ করে ও প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করে। ভাষার উপর আঘাত মানে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মসম্মানের উপর আঘাত। একুশ তাই বাংলাদেশের মতো ভারতের বাঙালির কাছেও আত্মপরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে উঠেছে।


ভারত বহুভাষার দেশ— এই কথাটি আমরা গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করি। সংবিধান বহু ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাস্তব জীবনের ক্ষমতার কাঠামোয় ভাষার অবস্থান সমান নয়। শিক্ষা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট ভাষা ক্রমশ ক্ষমতার ভাষা হয়ে উঠেছে। বহু মাতৃভাষা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে ঘরের ভেতরে বা আবেগের পরিসরে। এই প্রান্তিককরণ মানুষের সামাজিক অবস্থান, আত্মমর্যাদা ও সুযোগের বৈষম্য প্রকাশ করে।

শহুরে জীবনে আজ ভাষা এক অদ্ভুত দ্বিধার মধ্যে দাঁড়িয়ে। প্রয়োজনের কারণে ভাষার সংমিশ্রণ অনিবার্য— এ কথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ভাষা আর প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে। বাংলা বাক্যের মধ্যে ইংরেজি শব্দের অনিয়ন্ত্রিত অনুপ্রবেশকে আমরা অনেক সময় আধুনিকতার চিহ্ন বলে ধরে নিই। অথচ ভাষা কেবল সাজের পোশাক নয়— ভাষাই চিন্তার কাঠামো নির্মাণ করে। নিজের ভাষাকে অবজ্ঞা করা মানে নিজের ভাবনাকেই ধীরে-ধীরে ঋণী করে তোলা।

এই প্রেক্ষিতেই একুশের চেতনা আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে। আমরা কি কেবল বাংলায় অনর্গল কথা বলে চলেছি, না কি বাংলায় ভাবছিও? ভাষা যদি কেবল আবেগের বিষয় হয়ে থাকে, তবে তা টিকবে না। ভাষা বাঁচে দৈনন্দিন ব্যবহারে— যে ভাষায় আমরা শিক্ষা দিই, প্রশাসনিক কাজ করি, সন্তানদের স্বপ্ন দেখতে শেখাই। ভাষাকে যদি আমরা কেবল স্মৃতির জায়গায় সরিয়ে রাখি, তবে তার ভবিষ্যৎ অনিবার্যভাবেই সংকুচিত হবে।
ভারতের মাটিতে ভাষার এই বাস্তব লড়াইয়ের এক উজ্জ্বল ইতিহাস মানভূমের ভাষা আন্দোলন। বর্তমান পুরুলিয়া জেলা ও সংলগ্ন অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাংলাভাষী হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন প্রশাসন ও শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলা ছিল উপেক্ষিত। বিহার প্রদেশের অন্তর্গত থাকা অবস্থায় বিদ্যালয়, অফিস ও আদালতে ধীরে-ধীরে বাংলা ভাষাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। ভাষা ছিল সেখানে অস্তিত্বের প্রশ্ন।

এই অবমাননার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা ছিল শান্তিপূর্ণ কিন্তু দৃঢ়। কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, নারী— সমাজের নানা স্তরের মানুষ যুক্ত হয়েছিলেন সেই সংগ্রামে। টুসু গানের সুরে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ভাষা আন্দোলন তখন কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে আবদ্ধ না থেকে হয়ে উঠেছিল এক সাংস্কৃতিক জাগরণ। রাষ্ট্রীয় দমননীতি, গ্রেফতার, লাঠিচার্জ— কিছুই সেই ভাষা-আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। অবশেষে ১৯৫৬ সালে পুরুলিয়ার পশ্চিমবঙ্গে অন্তর্ভুক্তি ভাষার অধিকারের এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি হয়ে ওঠে।

মানভূমের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভাষার সংগ্রাম কোনো একদিনের ঘটনা নয়। এ এক দীর্ঘ সামাজিক প্রক্রিয়া, যেখানে ভাষা ও মানুষ একে অপরের অস্তিত্ব রক্ষা করে। একুশ আর মানভূম একই সুতোর দুই প্রান্ত— একটি রক্তের প্রতীক, অন্যটি ধৈর্য ও সংগঠনের।

ভাষাদিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা আমাদের সমাজে কম নয়। কিন্তু ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় অভ্যাসে। বাংলা-মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট, প্রশাসনে মাতৃভাষার সীমিত ব্যবহার, উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বাংলার দুর্বল উপস্থিতি— এ সবই ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের উদাসীনতার লক্ষণ। মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা মানেই নিম্নমান— এই ধারণা শুধু ভুল নয়, বিপজ্জনকও। জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও ডিজিটাল পরিসরে ভাষার সক্রিয় উপস্থিতি ছাড়া ভাষা আধুনিক সমাজে শক্তিশালী হতে পারে না। বাংলা ভাষাকে আবেগের খাঁচায় বন্দি না রেখে তাকে জ্ঞানের বাহনে রূপান্তর করাই আজ সময়ের দাবি।

একুশ আমাদের শিখিয়েছে মাথা নত না করতে। মানভূম আমাদের শিখিয়েছে সংগঠিত হয়ে ধৈর্যের সঙ্গে লড়তে। আজ সিদ্ধান্ত আমাদেরই— ভাষাকে জীবনের কেন্দ্রে রাখব, না কি স্মৃতির জাদুঘরে তুলে রাখব। ভাষা কেবল শব্দ নয়। ভাষা নাগরিক অধিকারের অংশ, আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। মাতৃভাষাকে সম্মান করা কোনো আবেগী বিলাসিতা নয়—এটি একটি গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই একুশের রক্ত সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।