ভাষা ও সংস্কৃতি দুয়ে মিলে হয় জাতির প্রতিচ্ছবি

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

সন্দীপন বিশ্বাস

মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর একটি শিশুর পারিপার্শিক কোলাহল, বর্ণিল বৈচিত্র্য, প্রাণের উচ্ছ্বাস, প্রকৃতির আলােড়ন সবকিছু তাকে বিস্ময়াভিভূত করে তােলে। শিশু প্রাণে তৈরি হয় প্রকাশের ব্যাকুলতা। আর সেই ব্যাকুলতা থেকেই উচ্চারিত হয় ধ্বনি। আহা কী প্রশান্তি অভিব্যক্তিতে! কী তৃপ্তি এ উচ্চারণে! মানুষের মনে যে আবেগ-অনুভূতির জাগরণ হয়, কথার উঠে ক্ষণে ক্ষণে। যে স্বপন তাড়িয়ে বেড়ায়— সবই তাে ভাষা দিয়েই প্রাণময় করে তােলে। মানুষের ভেতর অভিব্যক্তির চিরন্তন হয় তার চাই প্রাঞ্জল, সাবলীল ভাষা। আর মাতৃভাষা বাংলা ছাড়া সে তেষ্টা নিবারণের জন্য উৎকৃষ্ট আর কী হতে পারে?

পূর্বে জানতাম না, এ ভাষার আদিতম রূপ কী৷ ১৯০৭ সালে আকস্মিকভাবেই পেয়েছি চর্যাপদ; যা এ পর্যন্ত জানা বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন। সহস্র বছরের এ ভাষা পুরােপুরি অভিন্ন ছিল না সব কালে। সেইজন্যই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নিজেই চর্যাপদের ভাষার অস্পষ্টতা আর দুর্বোধ্যতার কারণে এর নাম দিয়েছিলেন সান্ধ্যভাষা। সেই ভাষাই ছড়িয়েছে নিজের স্বপ্ন, নিজের ভাবনার রূপ অন্যের মাঝে অনায়াসে। আর তাই ভাষা হল একটি সংস্কৃতির মূল। সেই মূলে বহমান সমকালীন প্রতিটি উপাদান সংস্কৃতির বৃক্ষকে করে তােলে মহীরুহ, দিনে দিনে আর ভাষা ও সংস্কৃতি দুয়ে মিলে হয় জাতির প্রতিচ্ছবি।


বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে।’ তাই আমাদের শিখতে হবে, কীভাবে নিজের ভালোর সবটুকু বিসর্জন না দিয়ে পরের ভালোটুকু গ্রহণ করা যায়। মানব ইতিহাসে নেওয়ার এবং দেওয়ার ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রোমান জাতি। রোমান সেনাবাহিনী, রোমান যুদ্ধকৌশল ছিল প্রায় অপ্রতিরোধ্য। সাম্রাজ্য বিস্তারের কালে রোমানরা অধিকৃত অঞ্চলে ল্যাটিন ভাষা, রোমান আইন, রোমান চিন্তাধারা ছড়িয়ে দিয়েছিল। গ্রিক ভাষা ল্যাটিনের তুলনায় উন্নত ছিল, রোমানরা গ্রিক শিখেও ছিল, কিন্তু উন্নত গ্রিক ভাষা নয়, অপেক্ষাকৃত অনুন্নত ল্যাটিন ভাষাকে অবলম্বন করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল তারা, কারণ ল্যাটিন ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ রোমান জনসাধারণের বোধগম্য ভাষা। বাংলা ভাষার অস্তিত্বের স্বার্থেই বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ হতে হবে বাংলা ভাষায়। নব নব ভাব, শব্দ ও বাক্যবন্ধ বাংলা ভাষায় যদি প্রবেশ না করে, তবে আমাদের প্রিয় ভাষাটি সর্ব কাজে ব্যবহারযোগ্য একটি চৌখস ভাষা হয়ে উঠবে না।

বর্তমানে এদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা বিশ্বজুড়ে বেড়ে চলেছে। মাতৃভাষার সংখ্যার বিচারে বাংলা ভাষা পৃথিবীর একটি শক্তিশালী ভাষা। মানুষের ভাষা ব্যবহারের সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসেবে বাংলা ভাষার অবস্থান সপ্তম। আমাদের মাতৃভাষার জন্য এ এক বিশাল গৌরব। পৃথিবীতে চার সহস্রাধিক ভাষার মধ্যে সপ্তম স্থানে থাকা বাংলা ভাষা প্রকৃত অর্থেই দাবি করতে পারে গৌরবের আসন। বর্তমানে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ঢাকার রাজপথে ঘটেছিল বাঙালির ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার ঘটনা। ‘বাংলা ভাষা প্রাণের ভাষা’ স্লোগানে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেয় বাঙালি তরুণ প্রজন্ম। এর ফলে পরবর্তীকালে ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাদের ৩০তম সম্মেলনে ২৮টি দেশের সমর্থনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এখন পৃথিবীতে একমাত্র বাংলাদেশেরই রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এছাড়া আমাদের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে ত্রিপুরা, আসামের অন্যতম প্রশাসনিক ভাষা বাংলা। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে বহির্বিশ্বে ৩০টি দেশের ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠনপাঠন চালু রয়েছে সেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার অবাঙালি পড়ুয়া বাংলা ভাষা শিক্ষা ও গবেষণার কাজ করছে। একমাত্র আফ্রিকার সিয়েরালিওনে বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সংসদ বাংলাকে স্বীকৃতির বিল পাস করে। এমনকী লন্ডনে সরকারিভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনপ্রিয় ভাষার মর্যাদা পেয়েছে আর্ন্তজাতিক ভাষা বাংলা। সম্প্রতি লন্ডনে বাংলা ভাষাকে এই স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। লন্ডনে বর্তমানে প্রায় ৭২ হাজার বাংলা ভাষাভাষী লোক রয়েছে। এখানে জনসংখ্যার আনুপাতিক হার ও ভাষার জনপ্রিয়তার দিক থেকে ইংরেজির পরেই বাংলা ভাষার অবস্থান।
এক্ষেত্রে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের উক্তি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘অনেকে ইংরেজি লেখায় লব্ধপ্রতিষ্ঠ হইয়াও বাঙ্গালা আরম্ভ করিতেছেন। ক্রমে লোকের সংস্কার দাঁড়াইতেছে যে, নানা ভাষা শিখিব, নানা দেশ দেখিব, কিন্তু লিখিব নিজ ভাষায়।’

বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে অনেক কবি-সাহিত্যিক পৃথিবীতে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। যেমন— বড়ুচণ্ডীদাস, চণ্ডীদাস, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, আলাওল, রায়গুণাকার ভারতচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল ইসলাম, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ। এই সকল সাহিত্যিকের রচিত সাহিত্যসম্ভার বিশ্বসাহিত্যের অনন্য সম্পদ। অনেক দীনতার মধ্যেও সাহিত্যসম্পদের জন্য বাঙালি জাতি প্রকৃত অর্থেই গৌরব বােধ করতে পারে। এছাড়াও বাংলা ভাষায় সংগীত রচনা করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ গীতিকার বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নােবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা পৃথিবীতে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত পাশ্চাত্য সাহিত্যের দুর্নিবার আকর্ষণবশত ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় হাত দেন৷ পরবর্তীকালে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন বাংলা ভাষার কাছে। মধুসূদনও এ সত্যটি হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন যে অন্য ভাষা আত্মস্থ করলেও বাঙালির আসল প্রাণ-সঞ্জীবনী নিহিত রয়েছে বাংলা ভাষায়। তাই ‘বঙ্গভাষা’ নামক কবিতায় মধুসূদন লিখেছিলেন— ‘পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে মাতৃ-ভাষা-রূপে খনি, পূর্ণ মণিজালে।’ টপ্পাগানের কবি রামনিধি গুপ্ত গলায় সেই সুর শোনা যায়— নানান দেশের নানান ভাষা, বিনা স্বদেশী ভাষা পুরে কি আশা? তাই আমরা যথেষ্ট আশাবাদী যে, একদিন বাংলা ভাষার চর্চা স্বছন্দ ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে এবং আগামী দিনে অনেক শক্তিশালী লেখক বাংলা ভাষায় আত্মনিযুক্ত হবেন।

বাঙালি আপাতত একটি অভিবাসনপ্রবণ জাতি। অভিবাসনের প্রয়োজনে লাখ-লাখ বাঙালিকে বিদেশি ভাষা শিখতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজন ভাষা-শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কেন একাধিক ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করা যাবে না? বিদেশি ভাষায় বাংলা ভাষার সাহিত্যকর্মের অনুবাদ হওয়া প্রয়োজন। ভারতের চারপ্রান্তে এবং পৃথিবীর বিখ্যাত শহরগুলিতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হলে বিদেশিরা বুঝবে যে, বাংলার একটি উন্নত ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। বিদেশিরা এদেশে এসে বাংলা ভাষা শিখবে, বাঙালি সংস্কৃতিকে জানবে। সমস্যা হচ্ছে, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আমরা পৃথিবীর অনেক জাতির তুলনায় পিছিয়ে আছি। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা একটি জাতির সাহিত্য যত উন্নতই হোক, সেই সাহিত্য পাঠে অন্য জাতির লোকেরা সাধারণত আগ্রহী হয় না। তাই এই সমস্যার সমাধানে বিদেশিদের বাংলা ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে দেশে এবং বিদেশে। পশ্চিমবঙ্গে এসে বাংলা ভাষা অধ্যয়নে ইচ্ছুক বিদেশি শিক্ষার্থীদের যেসব জটিলতা এখনও আছে, সেগুলো দূর করতে হবে। ফরাসিরা আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, ইংরেজরা ব্রিটিশ কাউন্সিল, আমেরিকানরা আমেরিকান সেন্টার এবং সোভিয়েতরা রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছিল। সাম্প্রতিক কালে চিনারা প্রতিষ্ঠা করছে কনফুসিয়াস সেন্টার।

পৃথিবীর সর্বত্র প্রচুর অর্থ বৃত্তি দিচ্ছে তারা চিনা ভাষা শেখাতে, চিনে গিয়ে লেখাপড়া করতে। এইসব প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম লক্ষ্য সংশ্লিষ্ট জাতির ভাষা ও সংস্কৃতি প্রচার। উন্নত জাতি মাত্রেই নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি প্রচারের ওপর জোর দেয়, রোমানরা যেমনটা করেছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধিবিমুখ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে শুধু সংখ্যার কারণেই বাঙালি জাতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পেয়ে যাবে। ভবিষ্যতের সেই অবস্থানকে ন্যায়সংগত ও মজবুত করার স্বার্থে বর্তমানে জ্ঞানচর্চা বাঙালির আশু কর্তব্য। অতীতের একাধিক অগ্রসর জাতির ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, কার্যকর এবং সর্বজনীন জ্ঞানচর্চার অপরিহার্য মাধ্যম হতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠের মুখের ভাষা, অর্থাৎ আমাদের ক্ষেত্রে বাংলা। কোনও জাতির অন্য কোনও বিনিয়োগই ভাষা কিংবা শিক্ষায় বিনিয়োগের মতো সুদূরপ্রসারী অভিঘাতসম্পন্ন হয় না। ভাষাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও কূটনীতির সঠিক প্রয়োগ হলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী হতেও পারে, অনেকটা ল্যাটিন ভাষা ও রোমান আইনের মতো। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বলতর হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।