সৌহার্দ্যপূর্ণ আঙ্গিকে সানন্দে জমি অধিগ্রহণ

Photo: প্রতীকী ছবি (Magnific)

গুজরাতে আহমেদাবাদ শহরের পশ্চিম দিকে নগর সীমানা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে এক-ফসলি কৃষিপ্রধান একটি গ্রাম— যার নাম হল সানন্দ। এই মুহূর্তে ভারতের বিখ্যাত অটোমোবাইল হাব হিসাবে এই সানন্দ আজ সর্বজনপরিচিত। চরিত্রে বা বিষয়বৈচিত্রে ভারতের আর বাকি গ্রামের থেকে খুব একটা আলাদা ছিল না। বেশিরভাগ অঞ্চল ছিল মরুভূমির মতো শুকনো কাটা ঘাসে ভরা আর বাকি সামান্য কিছু অংশে বৃষ্টির জলের ওপর নির্ভর করে ধান আর গমের চাষ হত। ১৯৮৫ সালে এখানে বিঘা প্রতি দাম ছিল ৫ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা অর্থাৎ প্রতি একরের মূল্য হল ১২ হাজার টাকা থেকে ৩৭ হাজার টাকা। প্রতি বর্গফুটের দাম ১ টাকারও কম হওয়ায় জমির কেনাবেচা খুব একটা হতো না। যা হতো— তা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নগদ অর্থের বিনিময়ে সম্পন্ন হত। জমির কোনও বাণিজ্যিক মূল্য বা প্রিমিয়াম ছিল না বললেই চলে। ২০০৮ সালে আমাদের রাজ্যের প্রশাসকদের অবিমৃষ্যকারিতার ফলে এই সাধারণ গ্রামটির ভাগ্য সম্পূর্ণ বদলে গেল।

পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুর থেকে টাটা মোটরসের ন্যানোকে যখন তাড়িয়ে দেওয়া হল তখন গুজরাত সরকার আনন্দ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানাধীন ১১০০ একর জমি টাটা মোটরসকে গাড়ি তৈরির কারখানার জন্য দিয়ে দেয়। ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে যখন ফোর্ড এবং অন্যান্য বড় বড় গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী সহায়ক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করল, তখন রাজ্য সরকার আর বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা প্রতি বিঘা জমি ১৮ লক্ষ টাকা থেকে ৩০ লক্ষ টাকায় অর্থাৎ ৪৫ লক্ষ টাকা থেকে ৭৫ লক্ষ টাকায় এক একর জমি কিনতে শুরু করল। যেসব কৃষকদের কোনও ব্যাঙ্ক একাউন্ট ছিল না, তাঁরা কার্যত রাতারাতি কোটিপতি হয়ে গেলেন।

সানন্দের এই ঘটনা সারা ভারতের জমির মালিকদের এই ধারণাই দিয়েছে শিল্পের জন্য জমি, সরকার কম দামে কিনে নিয়ে শিল্প গড়ে ওঠার পর যখন আশেপাশের জমির দাম আকাশচুম্বি হয়ে যায়— তখন মনে হয় বছর দুয়েক আগে এত সস্তায় জমে বিক্রি না করে ধরে রাখলে অনেক বেশি লাভবান হতে পারতাম। তাই শিল্পের জন্যে জমি অধিগ্রহণ— এই মুহূর্তে একটা বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ।


পশ্চিমবঙ্গের জমির চরিত্রটা অন্যান্য রাজ্যদের থেকে অনেকটা আলাদা। রাজ্যে মোট ৮৮.৭ লক্ষ হেক্টর ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে ৫৫. ৫ থেকে ৫৮ লক্ষ হেক্টর জমি বিশেষভাবে ধান চাষের জন্যে ব্যবহৃত হয়। অবশিষ্ট জমি যার পরিমাণ হল ৩২ লক্ষ থেকে ৩৪.৫ লক্ষ হেক্টর— যার মধ্যে রয়েছে বনভূমি, জলাশয়, শহরের বসতি, পাথুরে পশ্চিমাঞ্চলীয় উচ্চভূমি আর কৃষির অনুপযোগী অঞ্চল।

উর্বর ধান ক্ষেতে ভারী শিল্প স্থাপন একটা চিরায়ত অর্থনৈতিক আর পরিবেশগত বিরোধের কারণ হিসাবে দেখা যায়। ধানক্ষেত নিচু, সমতল, জলধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন আর কাদামাটি সমৃদ্ধ হওয়ায়— এগুলি কাঠামোগত ও পরিবেশগতভাবে ভারী শিল্প স্থাপনার জন্য প্রতিকূল। পশ্চিমবঙ্গে উর্বর ও বহুফসলি কৃষি জমি ভারী শিল্প কারখানার পক্ষে ব্যবহারের উপযোগী নয়। তাই প্রয়োজন অকৃষিযোগ্য, শুষ্ক বা পাথুরে জমি যা কৌশলগতভাবে নদী, মহাসড়ক আর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত।

পশ্চিমবঙ্গে ভারী শিল্পের জন্য পশ্চিম ল্যাটেরাইট অঞ্চল অর্থাৎ পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমানকে বেছে নিতে হবে। রাঢ় অঞ্চল নামে পরিচিত এই জেলাগুলির বৈশিষ্ট্য হল শুষ্ক, পাথুরে, লাল ল্যাটেরাইট মাটি, যার জলধারণ ক্ষমতা খুব কম। উর্বর গাঙ্গেয় সমভূমির তুলনায় এই অঞ্চলে কৃষি কাজের সম্ভাবনা সম্ভবনা কার্যত শূন্য। কিন্তু এই জাতীয় মাটির ভূভার বহনক্ষমতা বিশাল— যা এই অঞ্চলগুলিতে ভারী যন্ত্রপাতি, চুল্লি আর বিশাল ঢালাই কারখানার পক্ষে খুবই অনুকূল। ভারী উৎপাদন শিল্পের জন্য প্রচুর বিদ্যুৎ, জল আর পরিবহনের প্রয়োজন হয়। পশ্চিম বর্ধমান এবং পুরুলিয়া সরাসরি কয়লাখনি অঞ্চলের অবকাঠামোর ওপরে অবস্থিত, দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের গ্রিড দ্বারা অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ আর প্রধান রেল মালবাহী করিডোরগুলির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত রয়েছে।

জমি অধিগ্রহণকে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন এবং আকর্ষণীয় করার জন্যে সরাসরিভাবে সরকারকে বা সরকার সমর্থিত কোনও নগর উন্নয়ন সংস্থাকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এমন কিছু ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে, যাতে জমির মালিকরা জমি হস্তান্তর করে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মনে না করেন।

জমির মালিকেরা যদি অনুর্বর জমি শিল্পাঞ্চলের জন্যে ছেড়ে দেন— তাহলে দু-এক বছরের মধ্যে নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে। নতুন শিল্পাঞ্চলের মধ্যে আনুপাতিকভাবে কিছুটা ছোট সম্পূর্ণ পরিষেবাযুক্ত বাণিজ্যিক বা আবাসিক জমি ফেরত দিতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রদেয় জমির আয়তন কম হলেও তার বাণিজ্যিক মূল্য অনেকটা বেড়ে যাবে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা পরিকাঠামোগত উন্নয়ন শেষ হওয়ার পরে একটা লটারি বা সফটওয়্যার চালিত বরাদ্দের মাধ্যমে একটা চূড়ান্ত ভূমিস্বত্ত্ব, দলিলের সাহায্যে নির্দিষ্ট উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক/আবাসিক জমি বরাদ্দ করতে হবে।

সরকার অধিগৃহীত জমিকে যদি একটা আর্থিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে জমির মালিকেরা তাঁদের জমির উপর নির্মিত শিল্পপার্ক বা টাউনশিপ থেকে যে মোট লাভ হবে তা থেকে শেয়ার বা নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়া যেতে পারে।

জমি থেকে নিয়মিত আয়ের একটা পরিকল্পনা তৈরি করা যেতে পারে। এককালীন বড় অংকের টাকা অব্যবস্থাপনার ফলে খুব সহজেই কম সময়ের মধ্যে খরচ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে এককালীন টাকা দেওয়ার পরিবর্তে ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে একটা নিশ্চিত মুদ্রাস্ফীতিযুক্ত মাসিক বা বার্ষিক পেনশন দেওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক নিরাপত্তা বজায় থাকবে। জমির মালিকেরা ক্ষতিপূরণের টাকা ব্যবহার করে যদি কোনও বিকল্প সম্পত্তি ক্রয় করে— তার ওপর মূলধনী লাভের কর, স্ট্যাম্প শুল্ক আর নিবন্ধন বা প্রসেসিং ফি মুকুব করে দিতে হবে।

প্রতিটি পরিবারের প্রদেয় জমির আয়তন অনুযায়ী পরিবারের কিছু সদস্যকে নতুন যে শিল্প ওখানে গড়ে উঠবে, তার জন্য এই বিশেষ প্রকারের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের চাকরি নিশ্চিত করতে হবে। তার জন্যে আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা প্রয়োজন। শিল্পাঞ্চলের মধ্যে শপিং কমপ্লেক্স যা ইউটিলিটি কিয়স্কের একটা নির্দিষ্ট শতাংশ জমি প্রদেয় পরিবারগুলোর স্বাধীন ব্যবসা শুরু করার জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে। সন্তানদের জন্য বিনামূল্যে উচ্চমানের আবাসন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিক আর সেরা স্কুল-সহ আধুনিক আবাসিক কলোনি তৈরি করে দিতে হবে।

এসব ছাড়া সরকারের সঙ্গে জমির মালিকদের মধ্যে একটা চুক্তি হবে যাতে সরকার নিশ্চিত করবে— যদি আগামী ২৪ থেকে ৩৬ মাসের মধ্যে উন্নত প্লটগুলো হস্তান্তর করতে অথবা বার্ষিক/ পেনশন শুরু করতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রদেয় জমিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার মূল মালিকের কাছে ফেরত চলে যাবে। তাছাড়া সরকারকে একটা মোটা অঙ্কের আর্থিক জরিমানা জমির মালিকদের দিতে হবে।

সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশে জমি অধিগ্রহণ একটা বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ। জমি ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই এই মানসিকতায় বিশ্বাসী হতে হবে, আমরা কাউকে ঠকাবো না আর নিজেরাও ঠকবো না। তাই সময় এসেছে, নতুন আঙ্গিকে জমি অধিগ্রহণ— দৃষ্টিভঙ্গি আর মানসিকতার মধ্যে পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরী।