রাজনৈতিক সৌজন্যের নতুন দিগন্ত: মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধীদের উপস্থিতি

সুনীল মাইতি

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে রাজ্যের মেগা প্রশাসনিক বৈঠকে এক অভূতপূর্ব এবং ইতিবাচক মোড় দেখা গেল। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বিরোধী দল এবং প্রধান বিরোধী শিবিরের প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলার গণতন্ত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলার তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ; কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি এবং শাসক-বিরোধী চরম মুখ দেখাদেখি বন্ধের আবহকে এক লহমায় বদলে দিয়ে এই বৈঠকটি সম্পন্ন হল অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তীব্র মতাদর্শগত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে সমস্ত পক্ষকে একই প্রশাসনিক মঞ্চে নিয়ে আসতে পারা— মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর এক মস্ত বড় প্রাথমিক এবং কৌশলগত সফলতা।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলার রাজনীতিতে এক ধরনের অস্পৃশ্যতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে শাসক এবং বিরোধী শিবিরের মুখোমুখি বসা দুরস্থান, সৌজন্য বিনিময়ের সুযোগও ছিল সীমিত। এই অচলাবস্থা ও রাজনৈতিক জড়তা ভেঙে বিরোধীদের সসম্মানে ডেকে আনা এবং তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রমাণ করে যে, সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় আলোচনার পথ কখনো রুদ্ধ হতে পারে না। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী এই বৈঠকে যে প্রশাসনিক পরিপক্কতা, ধৈর্য এবং উদারতা দেখিয়েছেন, তা দলমত নির্বিশেষে রাজ্যের আপামর মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্বসুলভ ভাবমূর্তিকে বহুগুণ উজ্জ্বল করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, অতীতেও মুখ্যমন্ত্রীদের কার্যকালের শাসক-বিরোধী সম্পর্কের ওঠাপড়া রাজ্যের শাসন ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
উদাহরণস্বরূপ, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর দীর্ঘ শাসনকালে বামফ্রন্টের সঙ্গে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত জটিল। জ্যোতি বসু সংসদীয় রীতিনীতির প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা বজায় রাখতেন এবং বিধানসভায় তৎকালীন বিরোধী দলনেতা সিদ্ধার্থশংকর রায় বা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত স্তরে সৌজন্যের সম্পর্কে ছিল। কিন্তু কোনও বড় জেলাভিত্তিক প্রশাসনিক পর্যালোচনায় বা নীতি নির্ধারণে বিরোধীদের ডেকে এনে তাঁদের প্রত্যক্ষ অংশীদার করার প্রাতিষ্ঠানিক চল তৎকালীন বাম জমানাতেও সেভাবেই গড়ে ওঠেনি।
পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে এই দূরত্বের খেসারত রাজ্যকে দিতে হয়েছিল সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়। বুদ্ধদেববাবু শিল্পায়নের প্রশ্নে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার চেষ্টা করলেও, তা সঠিক সময়ে এবং সঠিক মঞ্চে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। ফলে তৈরি হয়েছিল এক চরম অবিশ্বাসের পরিবেশ, যা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের পতন ত্বরান্বিত করেছিল। এমনকি পরবর্তী তৃণমূল জমানাতেও শাসক ও প্রধান বিরোধীদলের মধ্যে দূরত্ব এবং সংঘাত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, নবান্নের কোনও প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধীদের উপস্থিতি ছিল এক প্রকার অকল্পনীয়। অতীতে রাজভবন বা বিধানসভায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক হলেও নবান্ন বা মহাকরণের মতো প্রশাসনিক সদর দপ্তরে মুখ্যমন্ত্রী নিজে উদ্যোগী হয়ে বিরোধীদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করার নজির এ রাজ্যে বিরল ।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই সময়োপযোগী উদ্যোগ এবং বিরোধীদের তাতে ইতিবাচক সাড়াকে দেখতে হবে। এই সফলতার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রভাব রয়েছে—
মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার পর থেকেই শুভেন্দু অধিকারী দলমত-নির্বিশেষে রাজ্যের সব এলাকার সুষম উন্নয়নের কথা বলে আসছেন। এই বৈঠক প্রমাণ করে যে, তিনি স্রেফ বক্তৃতায় নয়, বাস্তবেও গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
জেলাভিত্তিক বা রাজ্য স্তরের প্রশাসনিক বৈঠকে যখন জনকল্যাণমুখী প্রকল্প, কেন্দ্রীয় বরাদ্দ এবং পরিকাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়, তখন সেখানে বিরোধী বিধায়ক বা প্রতিনিধিদের এলাকার দাবিদাওয়া উপেক্ষিত থাকলে আখেরে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হন। এই বৈঠকে বিরোধী প্রতিনিধিদের উপস্থিতির ফলে তাঁদের নিজ নিজ এলাকার অভাব-অভিযোগ সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথ সুগম হলো।
বাংলার আমজনতা দীর্ঘদিন ধরে যে উগ্র রাজনৈতিক হিংসা ও তিক্ততা থেকে অভ্যস্ত, তার বিপরীতে মুখ্যমন্ত্রীর এই সৌহার্দ্যপূর্ণ দৃশ্য সমাজ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে এক বিরাট স্বস্তির বার্তা পাঠিয়েছে।
তবে এই প্রাথমিক সফলতাকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে মুখ্যমন্ত্রীকে আগামী দিনেও এই ধারা বজায় রাখতে হবে। প্রথমত, বিরোধীদের এই অংশগ্রহণ যেন স্রেফ একটি বা দুটি বৈঠকের ‘ফটো-সেশন’ বা সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সীমাবদ্ধ না থাকে। বৈঠকে বিরোধী দলনেতা যে সমস্ত সুনির্দিষ্ট দাবি বা দুর্নীতির অভিযোগ তুলবেন সেগুলোর উপর নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী। বৈঠকে বিরোধী দলগুলো যে সমস্ত নির্দিষ্ট দাবি বা এলাকাভিত্তিক বঞ্চনার অভিযোগ তুলবে, সেগুলোর উপর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি প্রকল্পের সুফল যেন রাজনৈতিক রঙ না দেখে প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছয়, তার তদারকি করাও তাঁর অন্যতম বড় দায়িত্ব।
অন্যদিকে এই বৈঠকে বিরোধী নেতাদের অংশগ্রহণও তাঁদের ইতিবাচক ও গঠনমূলক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেওয়া দরকার। কেবল রাজপথে আন্দোলন নয়, প্রশাসনিক টেবিলে বসে যুক্তি ও তথ্য দিয়ে সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং নিজের এলাকার মানুষের অধিকার আদায় করাও একজন দায়িত্বশীল বিরোধী নেতার কাজ।
নবান্নের এই বৈঠক বাংলার দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের এক ইতিবাচক ইঙ্গিত। জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় যা অধরা থেকে গিয়েছিল বা যে দূরত্বের কারণে অতীতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই প্রাচীন জড়তা ভেঙে এক নতুন এবং অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছেন। এই প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধীদের অন্তর্ভুক্তি এবং মুখ্যমন্ত্রীর এই সমন্বয়ী অবস্থান যদি আগামী দিনেও বজায় থাকে, তবে তা পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন ও সোনালি অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। আর এইখানেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর দূরদর্শিতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং প্রাথমিক সফলতার আসল সার্থকতা।