কলকাতা পুরভোট দেখাবে নতুন দিশা

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসকে কেন্দ্র করে যে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে, কলকাতা হাই কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশে আপাতত তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়েছে। ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা মামলায় আদালত অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করেছে। ফলে ২০৯টি ওয়ার্ডের ভিত্তিতে কলকাতা পুরসভার আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে কোনও আইনি বাধা নেই। প্রশাসন ও রাজ্য নির্বাচন কমিশনের উচিত, আদালতের এই নির্দেশকে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
তবে আদালতের নির্দেশের তাৎপর্য বুঝতে হলে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের বিজ্ঞপ্তির উপর আপাতত কোনও স্থগিতাদেশ নেই। দ্বিতীয়ত, পুনর্বিন্যাসের বৈধতা নিয়ে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্য রাজ্যকে তিন সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তার পর মামলাকারীরা চার সপ্তাহের মধ্যে তাঁদের বক্তব্য জানাতে পারবেন। ছয় সপ্তাহ পরে মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। অর্থাৎ, আদালত এখনই পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বৈধ বলে ঘোষণা করেনি, আবার সেই প্রক্রিয়া বন্ধ রাখার নির্দেশও দেয়নি। এই অবস্থায় আইনি প্রক্রিয়া চলার পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়াই যুক্তিসংগত।
বস্তুত, কলকাতা পুরসভার নির্বাচন কোনও ছোটখাটো প্রশাসনিক আয়োজন নয়। ২০৯টি ওয়ার্ডে সম্ভাব্য বুথের সংখ্যা ৪,৭১১। ভোট পরিচালনার জন্য প্রয়োজন প্রায় ২২ হাজার ৬০০ ভোটকর্মী। তাঁদের প্রশিক্ষণ, বুথ নির্ধারণ, ভোটগ্রহণের পরিকাঠামো তৈরি এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই যথেষ্ট সময় ও পরিকল্পনা প্রয়োজন। রাজ্য নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী নভেম্বর থেকে ভোটকর্মীদের প্রশিক্ষণ শুরু হওয়ার কথা। আদালত যখন এই মুহূর্তে নির্বাচনী প্রস্তুতি বন্ধ রাখার কোনও নির্দেশ দেয়নি, তখন অকারণে সেই কাজ থামিয়ে রাখার যুক্তি নেই। বরং নির্ধারিত সময়সূচি মেনে প্রশাসনিক কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত।
অবশ্য ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস নিয়ে মামলাকারীদের অভিযোগও উপেক্ষা করা যায় না। তাঁদের প্রশ্ন, পুনর্বিন্যাসের বিজ্ঞপ্তি জারির আগে নির্ধারিত আইনি বিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না এবং পুরসভার প্রশাসক কিংবা কমিশনারের এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা নেওয়ার আইনি অধিকার কতটা। এই প্রশ্নগুলির উত্তর আদালতেই নির্ধারিত হবে। তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিএমের পক্ষ থেকেও মামলায় বক্তব্য জানানোর আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক এখনও অব্যাহত। কিন্তু বিতর্কের অস্তিত্ব মানেই প্রশাসনিক কাজ বন্ধ রাখতে হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।
এর পাশাপাশি ভোটার তালিকা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিচারাধীন তালিকা থেকে বহু ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ এবং ট্রাইব্যুনালে আবেদন নিষ্পত্তির ধীরগতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে স্বস্তিদায়ক নয়। যোগ্য কোনও নাগরিক যেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের বিতর্ক এবং ভোটার তালিকার সংশয়— দুটিরই স্বচ্ছ নিষ্পত্তি জরুরি। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, আদালত স্থগিতাদেশ না দেওয়ায় পুরভোটের প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়ার পথ খোলা রয়েছে। মামলার চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় বসে থেকে নির্বাচনী আয়োজনের মূল্যবান সময় নষ্ট করা উচিত হবে না। আদালত তার বিচারবিভাগীয় দায়িত্ব পালন করবে, প্রশাসন পালন করবে তার সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব। একটির সঙ্গে অন্যটির সংঘাত বাধিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

কলকাতার নাগরিকদের দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত পুরবোর্ডের প্রয়োজন রয়েছে। নাগরিক পরিষেবার কাজে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পুরভোট নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হওয়া কাম্য নয়।