কেরল ও আসাম— দুটি ভৌগোলিকভাবে দূরবর্তী, সাংস্কৃতিকভাবে স্বতন্ত্র রাজ্য— একই দিনে বিধানসভা নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সূচনা করল। এই নির্বাচনী ঋতুতে পরে যুক্ত হবে তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গও। কিন্তু কেরল ও আসামের নির্বাচনী লড়াই, তার চরিত্র ও রাজনৈতিক অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, এক বিশেষ মনোযোগ দাবি করে।
দুটি রাজ্যে ক্ষমতাসীন শক্তির রাজনৈতিক দর্শন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। কেরলে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এলডিএফ), যার নেতৃত্বে রয়েছে সিপিআইএম। তারা দীর্ঘদিন ধরে একটি বিকল্প উন্নয়ন মডেল ও কল্যাণনীতির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। অন্যদিকে আসামে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি, যার রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে জাতীয়তাবাদ, পরিচয়ের রাজনীতি এবং ধর্মীয় মেরুকরণের উপর। তবু, এই ভিন্নতার মধ্যেও কিছু তাৎপর্যপূর্ণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রথমত, দুই রাজ্যেই ক্ষমতাসীন দল তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্যে লড়ছে। আসামে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আবার জয়ী হলে এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। কেরলেও বাম শিবির একই লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। দ্বিতীয়ত, দুটি ক্ষেত্রেই প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে রয়েছে কংগ্রেস। ফলে এই নির্বাচন কেবল আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রশ্ন নয়, বরং জাতীয় স্তরে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ।
কেরলে কংগ্রেসের জয় দক্ষিণ ভারতে তার অবস্থানকে আরও মজবুত করতে পারে, বিশেষত যখন তেলেঙ্গানা ও কর্নাটকে তাদের উপস্থিতি ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে আসামে বিজেপির জয় উত্তর-পূর্ব ভারতে তাদের প্রভাব আরও সুদৃঢ় করবে। অর্থাৎ, এই দুটি রাজ্যের ফলাফল জাতীয় রাজনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে প্রতিফলিত হবে, এ কথা বলাই যায়।
তবে নির্বাচনী প্রচার এবং মূল ইস্যুগুলির বিচারে কেরল ও আসামের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যও চোখে পড়ে। আসামে নির্বাচনী লড়াই অনেকাংশেই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও তীব্র বাক্যবাণে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গৌরব গগৈয়ের মধ্যে সংঘাত প্রায় ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই প্রেক্ষাপটে নীতিগত বা উন্নয়নমূলক আলোচনার পরিসর সংকুচিত হয়েছে বলেই মনে হয়।
আসামে বিজেপির প্রচারে বারবার উঠে এসেছে ধর্মীয় মেরুকরণ, পরিচয়ের রাজনীতি এবং ‘অনুপ্রবেশ’-এর মতো ইস্যু, যেগুলি প্রায় প্রতি নির্বাচনের আগেই নতুন করে উত্থাপিত হয়। অন্যদিকে কংগ্রেস শিবির মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আক্রমণ শানিয়েছে। ফলে আসামের নির্বাচনী আবহ অনেকাংশেই দ্বন্দ্বমুখর, সংঘাতপ্রবণ এবং আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছে।
কেরলের নির্বাচনী চিত্র তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বিস্তৃত ও বিষয়ভিত্তিক। এই রাজ্যের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে কর্মসংস্থানের কারণে সাম্প্রতিক পশ্চিম এশিয়ার সঙ্কটও নির্বাচনী আলোচনায় স্থান পেয়েছে। অভিবাসন, কর্মসংস্থান, রাজ্যের ঋণের বোঝা এবং কল্যাণমূলক প্রকল্পের কার্যকারিতা— এসবই ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে কেরল সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত, এমনটা বলা যাবে না। শবরীমালা মন্দির সংক্রান্ত বিতর্ক এখনও রাজনৈতিক দলগুলির কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে খ্রিস্টান চার্চও তাদের নিজস্ব প্রভাব-বলয় বজায় রেখেছে। অর্থাৎ, যুক্তিবাদী ও নীতিনির্ভর আলোচনার পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতিও এখানে নির্বাচনী সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, কেরল ও আসাম— এই দুই রাজ্যের নির্বাচন ভারতের গণতন্ত্রের দুই ভিন্ন মুখ তুলে ধরে। একদিকে রয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, আবেগপ্রবণ এবং মেরুকরণ-নির্ভর রাজনীতি; অন্যদিকে রয়েছে তুলনামূলকভাবে নীতিনির্ভর, বহুমাত্রিক ইস্যু-ভিত্তিক আলোচনা। এই দ্বৈত চিত্রই আজকের ভারতীয় রাজনীতির বাস্তব প্রতিফলন।
শেষ পর্যন্ত, কোন ইস্যু ভোটারদের মনে সাড়া জাগিয়েছে, তা স্পষ্ট হবে ফলাফল ঘোষণার দিন। কিন্তু এই নির্বাচন ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে– ভারতের গণতন্ত্রে বৈচিত্র্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সেই বৈচিত্র্যের মধ্যেও মিল ও পারস্পরিক প্রভাবের এক জটিল বিন্যাস।