কর্ণাটক: নেতৃত্ব বদল

পদত্যাগপত্র জমা দিলেন সিদ্দারামাইয়া

২০২৩ সালের কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস যে জয় পেয়েছিল, তা নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক ভারতীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ২০১৪ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া কংগ্রেসের কাছে এই জয় ছিল এক বিরল পুনরুত্থান। ২২৪ আসনের বিধানসভায় ১৩৫টি আসন জিতে ক্ষমতায় ফেরা শুধু সংখ্যার সাফল্য নয়, রাজনৈতিক কৌশল ও সামাজিক সমীকরণেরও এক কার্যকর উদাহরণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই সাফল্যের পর খুব দ্রুতই সামনে এসেছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, যা এখন দলটির ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

এই জয়ের পেছনে যে কয়েকটি প্রধান কারণ কাজ করেছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘অহিন্দা’ (AHINDA) সামাজিক জোট— অর্থাৎ সংখ্যালঘু, পশ্চাৎপদ শ্রেণি এবং দলিতদের একত্রিত করার কৌশল, যার মুখ্য স্থপতি ছিলেন সিদ্দারামাইয়া। পাশাপাশি, দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রচার, এবং দলীয় সংগঠনকে শক্তিশালী করে তোলার ক্ষেত্রে ডি কে শিবকুমারের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই সবকিছু মিলিয়ে কংগ্রেস একটি সুসংহত রাজনৈতিক বার্তা দিতে পেরেছিল।

কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কর্ণাটকের রাজনীতি অন্য এক পথে হাঁটতে শুরু করে। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া ও উপমুখ্যমন্ত্রী শিবকুমারের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে যে টানাপোড়েন শুরু হয়, তা ধীরে ধীরে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। এখন নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটল এবং শিবকুমার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন– এর ফলে এই দ্বন্দ্ব আরও জটিল হতে পারে। কারণ, এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং দলীয় ক্ষমতার কাঠামো ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত।


সিদ্ধারামাইয়া নিঃসন্দেহে এক জনভিত্তিক নেতা, যাঁর প্রভাব বিস্তৃত ওবিসি, সংখ্যালঘু এবং দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে। তাঁর নেতৃত্বে কংগ্রেস যে ‘পাঁচ গ্যারান্টি’ প্রকল্প চালু করেছে— যেমন নারীদের জন্য আর্থিক সহায়তা, যুবকদের জন্য ভাতা ইত্যাদি— তা সাধারণ মানুষের জীবনে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই ধরনের কল্যাণমূলক প্রকল্প রাজ্যের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। মূলধনী ব্যয়ের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এর পাশাপাশি, সামাজিক ও শিক্ষাগত সমীক্ষা বা কাস্ট সেনসাসের প্রশ্ন নতুন এক রাজনৈতিক বিভাজনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কর্ণাটকের প্রভাবশালী সম্প্রদায় যেমন ভোক্কলিগা ও লিঙ্গায়তদের সংখ্যা ও আর্থসামাজিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই বিষয়টি সঠিকভাবে সামাল না দিলে তা সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই জটিল প্রশ্নগুলির মোকাবিলা করার পরিবর্তে কংগ্রেস নেতৃত্ব এখনো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মেটাতেই বেশি ব্যস্ত।

শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠছে। বেঙ্গালুরু, যা দেশের প্রযুক্তি ও স্টার্ট-আপ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, আজও ভেঙে পড়া পরিকাঠামো, যানজট ও নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত। শুধু বেঙ্গালুরু নয়, রাজ্যের অন্যান্য শহরগুলিও উন্নয়ন ও বিনিয়োগের অভাবে পিছিয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে কর্ণাটকের অর্থনৈতিক অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আসলে বড় রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠী থাকা অস্বাভাবিক নয়। বরং, সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এই বৈচিত্র্য শাসনব্যবস্থাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। কিন্তু কর্ণাটকের ক্ষেত্রে এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব গঠনমূলক ভূমিকা না নিয়ে একধরনের সংকীর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। যখন কংগ্রেসকে জাতীয় স্তরে বিজেপির শক্তিশালী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তখন এই ধরনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কংগ্রেসের অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে কর্ণাটকের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শিবকুমারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ— দলীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে কার্যকর শাসন নিশ্চিত করা। আগামী দুই বছর তাঁর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। তিনি যদি এই সময়কে কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন, তাহলে কর্ণাটক একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। অন্যথায়, এটি কংগ্রেসের আরেকটি অপূর্ণ সম্ভাবনার গল্প হিসেবেই থেকে যাবে।

শেষ পর্যন্ত, কর্ণাটকের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— নির্বাচনে জয়লাভই শেষ কথা নয়; প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুরু হয় তার পরেই। ক্ষমতায় এসে সেই আস্থা ধরে রাখা, প্রশাসনে স্থিতিশীলতা আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করাই আসল পরীক্ষার মঞ্চ। কংগ্রেস যদি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে এই মূল দায়িত্ব থেকে সরে যায়, তবে ২০২৩ সালের জয় ইতিহাসে শুধু একটি ক্ষণস্থায়ী উজ্জ্বল মুহূর্ত হিসেবেই থেকে যাবে। কিন্তু যদি নেতৃত্ব পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ঐক্য ও দক্ষতার সঙ্গে পথচলা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে কর্ণাটক সত্যিই এক নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।