সাংবাদিকের সুরক্ষা, মুখ্যমন্ত্রীর পদক্ষেপ

Image: IANS

সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, গণতান্ত্রিক সমাজে এটি জনস্বার্থের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রহরী। সংবাদকর্মীরা প্রতিদিন নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে মানুষের কথা তুলে ধরেন, প্রশাসনের কাজের ওপর নজর রাখেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ করেন এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্র ও সরকারের একটি সেতুবন্ধন তৈরি করেন। সেই সাংবাদিকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এই প্রেক্ষাপটে রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী।

সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম কর্মীদের মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সাংবাদিকতা পেশার একটি বড় অংশ এখনও স্থায়ী চাকরি, নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো কিংবা পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষার বাইরে। বিশেষ করে ছোট সংবাদপত্র, আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং অনিয়মিত কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত বহু সাংবাদিকের কাছে পরিবারের চিকিৎসার ব্যয় একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। সেই জায়গায় পরিবার-পিছু পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা-সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ তাঁদের জীবনে বাস্তব স্বস্তি আনতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, এই সুবিধাকে শুধু অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডধারী সাংবাদিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সংবাদমাধ্যমের নিউজ ডেস্কে কর্মরত সাংবাদিক এবং অন্যান্য সংবাদকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ। সাংবাদিকতার পরিসর এখন অনেক বিস্তৃত। একজন প্রতিবেদক যেমন সংবাদ তৈরির অপরিহার্য অংশ, তেমনই ডেস্কের সম্পাদক, সাব-এডিটর, কপি এডিটর, নিউজরুমের অন্যান্য কর্মীও একটি সংবাদ প্রকাশের পিছনে সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রযুক্তির পরিবর্তনে সংবাদমাধ্যমের কাজের ধরনও বদলেছে। ফলে সরকারি সামাজিক সুরক্ষার সংজ্ঞাও সময়ের সঙ্গে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া জরুরি। এই সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের মাসিক পেনশন আড়াই হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্তও প্রশংসনীয়। সাংবাদিকতার দীর্ঘ কর্মজীবনে যাঁরা মানুষের সামনে সত্য তুলে ধরেছেন, তাঁদের কর্মজীবন শেষ হওয়ার পর আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি সমাজের বিবেচনায় থাকা উচিত। মূল্যবৃদ্ধির এই সময়ে পাঁচ হাজার টাকা খুব বড় অঙ্ক না হলেও আগের তুলনায় দ্বিগুণ পেনশন নিঃসন্দেহে প্রবীণ সাংবাদিকদের কিছুটা আর্থিক স্বস্তি দেবে। একই সঙ্গে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড না থাকা যোগ্য অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদেরও নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ আরও আশাব্যঞ্জক। কারণ সাংবাদিকতার বাস্তব অবদান কেবল একটি সরকারি পরিচয়পত্রের ওপর নির্ভর করে বিচার করা উচিত নয়।

দুর্গাপুজোর আগে কর্মরত সাংবাদিকদের তিন হাজার টাকা করে বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্যেও রয়েছে স্বীকৃতির একটি মানবিক বার্তা। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হল কলকাতা ও জেলার সাংবাদিকদের মধ্যে বোনাসের পুরনো বৈষম্য দূর করে যোগ্য আবেদনকারীদের সমান হারে অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। সংবাদ সংগ্রহের কাজ শুধু মহানগরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জেলার সাংবাদিকরাই অনেক সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমস্যা, মানুষের দুর্ভোগ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা গ্রামীণ সমাজের নানা পরিবর্তনের খবর সামনে নিয়ে আসেন। তাঁদের কাজের মূল্যায়নে সমতা থাকা তাই ন্যায্য।

তবে সামাজিক সুরক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও দায়িত্ব— দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে সমালোচনা এবং গঠনমূলক আলোচনা করার আহ্বান গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চেতনাকেই প্রতিফলিত করে। একই সঙ্গে দেশের স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দায়িত্বশীল থাকার কথাটিও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন সাংবাদিকতা কখনও সরকারের প্রতি অন্ধ সমর্থন নয়, আবার সমালোচনাও যেন তথ্য, যুক্তি ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে হয়— এই ভারসাম্যই সুস্থ গণমাধ্যমের ভিত্তি।

সরকারের এই উদ্যোগ তাই কেবল কিছু আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে তার গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হবে। এটি সাংবাদিকদের সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে নীতিগত গুরুত্ব দেওয়ার একটি পদক্ষেপ। এখন প্রয়োজন ঘোষিত সুবিধাগুলি যাতে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং সহজ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত যোগ্য সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম কর্মীদের কাছে পৌঁছয়, তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের পেনশন, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও কল্যাণমূলক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পথও খোলা থাকুক।