বিমলকুমার শীট
যে মাঠে ফসল নাই চাঁদ এসে তাহার শিয়রে
দাঁড়ায়েছে— চাঁদ, তুমি আসিয়াছ কাহাদের তরে
বাসমতী সন্তানেরা চলে গেছে ঘরে
অনেক ফেনার গন্ধে পৃথিবীর পুরোনো ভাঁড়ার
ভরে গেছে কত বার-বার
তার পর আজ আর নাই কিছু তার!
জীবনানন্দ ছিলেন একজন ছাত্রদরদী কবি। ছাত্র জীবনের হতাশা ও স্বপ্নহীনতার প্রতি কবির এক গভীর দরদ ফুটে উঠেছে। কবি জীবনানন্দ ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক বাঙালি কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক। জন্ম বরিশাল শহরে। তার পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু হলেও পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। তিনি বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে অংশ গ্রহণ করেন এবং মানবহিতৈষী কাজের জন্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হন। আর পিতা সত্যানন্দ ছিলেন বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক এবং ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র ব্রহ্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। শিক্ষাকতা করতেন ব্রজমোহন স্কুলে। এই পারিবারিক পরিবেশে তিনি বড় হয়েছে।
জীবনানন্দের পিতা কম বয়সে পুত্রের স্কুলে ভর্তি হওয়ার বিরোধী হওয়ায়, বাড়িতে মা কুসুমকুমারী দাশের কাছেই তাঁর বাল্যশিক্ষার সূত্রপাত। এরপর জীবনানন্দকে আট বছর বয়সে ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। এখান থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ও ব্রজমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স সহ বি এ ডিগ্রি লাভ করেন (১৯১৯)। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। কলকাতা সিটি কলেজে টিউটর হিসাবে অধ্যাপনা শুরু করেন (১৯২২-১৯২৮)। তারপর একে একে বাগেরহাট কলেজ (১৯২৯), রামযশ কলেজ, দিল্লি (১৯৩০-১৯৩১) ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল (১৯৩৫-১৯৪৮), খড়গপুর কলেজ (১৯৫১-১৯৫২), বড়িশা কলেজ (অধুনা বিবেকানন্দ কলেজ, কলকাতা)। সর্বশেষ হাওড়া গার্লস কলেজ (১৯৫৩-১৯৫৪) হয়ে তার অধ্যাপনার সমাপ্তি ঘটে। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তখন এই কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান। তিনি লিখেছেন, এই কলেজের ছাত্রীদের কাছ থেকে জীবনানন্দ প্রচুর শ্রদ্ধা পেয়েছেন। তবে তার কর্মজীবন মোটেই মসৃণ ছিল না।
কবি জীবনানন্দকে ছাত্ররা অন্তরের সঙ্গে শ্রদ্ধা করত। তিনি যখন ব্রজমোহন কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক, সে সময় তার স্ত্রী লাবণ্য দাশ ওই কলেজে পড়তেন। সেবারে হোলি উৎসবে কয়েকজন ছাত্র কবিকে আবির দিয়ে প্রণাম করতে এসেছিল। সবাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাঁকে আবির দিয়ে রাঙিয়ে দিচ্ছিল। তখন হঠাৎ তাদের মধ্যে একজন ছাত্র লাবণ্য দাশের ঘরে ঢুকে বলল, ‘আপনাকে রং দেব’। লাবণ্য দাশ ঘরে দাঁড়িয়ে বললেন ‘না’। পাশের ঘরে তাঁর শ্বশুর শুয়েছিলেন। তিনি ছেলেটিকে বিনা অনুমতিতে ঘরে ঢোকার জন্য কঠোরভাবেই তিরস্কার করেন। ফলে ছেলেটি রঙ না দিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।
ওই ঘটনায় কবি একটি কথাও বলেননি। ছেলেরা চলে যেতেই স্ত্রী লাবণ্যকে ডেকে তিনি বললেন, ‘হোলির সময় রঙ দেওয়াটা আমাদের দেশে একটা রীতি। এই দিনে ছাত্ররা অধ্যাপকদের বাড়িতে গিয়ে আবির দিয়ে সস্ত্রীক তাঁদের শ্রদ্ধা জানায়। তোমাকে ঠিক সেইভাবেই দিতে এসেছিল। স্নান করলেই তো রঙ উঠে যেত। তুমি এত বিরক্ত হলে কেন?’ কবি স্ত্রী লাবণ্যকে তিরস্কার করলেন না ঠিকই, কিন্তু ছাত্রের অপমানের তিনি যে ব্যথিত হয়েছেন, সেটা খুব ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিলেন।
কবি জীবনানন্দ ত্রিশের দশকে তাঁর পারিবারিক পদবি ‘দাশগুপ্ত’ না লিখে শুধু দাশ লিখতে শুরু করেন। তখন তফসিলি সম্প্রদায়ের বহু ছাত্র এসে তাঁকে বলত, ‘স্যার, আমাদের সমাজে আপনার মত এইরকম একজন প্রতিভাশালী লেখক ও সহৃদয় অধ্যাপক পেয়ে আমাদের সম্প্রদায়ের প্রতিটি নরনারী ধন্য হয়ে গিয়েছে।’ কবি বুঝতে পেরে ছিলেন তফসিলি সম্প্রদায়ের ওই ছাত্ররা এঁকে তাঁদের সম্প্রদায়ের একজন বলে মনে করত। এতে কবি উত্তর না দিয়ে মৃদু-মৃদু হাসতেন। তাঁর স্ত্রী এতে রাগ করলে বলতেন, ‘দেখো আমাকে সমগোত্রীয় ভেবে কেউ যদি ভুল করেও আনন্দ পায়, তবে সে ভুল ভাঙবার দরকার কী? কারও জন্যে কিছুই তো করতে পারি না। তারা নিজে থেকে যদি একটু আনন্দ পায় তো পাক না।’
১৯৪৬ সাল ছিল বাঙালির জীবনে স্মরণীয় দিন। ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর ঘটনা এই বৎসর ১৬ আগস্ট ঘটে। কবি ওই বৎসরের শেষদিকে ‘দৈনিক স্বরাজ’ পত্রিকায় রবিবাসরীয় সাহিত্য বিভাগে সম্পাদনার কাজ করতেন। পত্রিকার এই অংশটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই তিনি খড়গপুর কলেজ থেকে বদলি হয়ে অন্যত্র যান। ওই সময় একদিন দুপুরের দিকে তিনি কলকাতায় ক্রিক রো দিয়ে ফিরছিলেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন রাস্তার লোকেরা দৌড়ে যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে এবং প্রতিটি বাড়ির জানালা দরজা দুমদাম শব্দে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একটা মিলিটারি ট্রাক ছুটে এসে তাঁর সামনে থেমে গেল। একজন অফিসার নিচে নেমে বন্দুকের নলটি কবির বুকের সামনে ধরে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি ‘হিন্দু’ কিনা তারপর বন্দুক ধরা অবস্থাতেই বললেন, ‘আই থিংক ইউ আর দ্য রিংলিডার অফ দিস এরিয়া। জাস্ট গেট অন।’
কবি বরাবর ধীর স্থির প্রকৃতির। তিনি কথা না বলে ট্রাকে উঠে দেখলেন তাঁর মত আরও কয়েকজন হিন্দু ভদ্রলোককে আগেই ধরে আনা হয়েছে। তাঁরাও চুপচাপ বসে আছেন। কবিকে উঠিয়ে ট্রাকটি বহু জায়গা ঘুরে থানায় এসে থামল। সেখানে পৌঁছনোর পর একটা বেঞ্চে সকলকে বসিয়ে রাখা হল। ‘কতক্ষণ এখানে বসে থাকতে হবে?’ এই প্রশ্নের উত্তরে এক কনস্টেবল অভদ্র ভাষায় বলে, ‘যতক্ষণ ওসি না আসেন, চুপ করে বসে থাক।’ অপমানিত হবার ভয়ে কবি কারোর সঙ্গে কোনওরকম কথা না বলে চুপচাপ বসেই রইলেন।
সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ সমস্ত পুলিশ শশব্যস্তে উঠে দাঁড়াল এবং অন্যান্য সকলকে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য করল। কবি দেখল অল্পবয়সী মুসলমান ছেলে হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে এবং যতই এগোচ্ছে ততই ঘনঘন অবাক হয়ে কবির দিকে তাকাচ্ছে। তারপর যখন প্রায় কাছে এসে পড়েছে, তখন এক ছুটে এসেই কবির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, ‘এ কি! স্যার আপনি এখানে এ অবস্থায় কেন?’ কবি তাঁকে চিনতে না পারলে ছেলেটি অভিমান ভরে বলল, ‘আমি আপনার বিএম (বরিশাল) কলেজের ছাত্র, আর আপনি আমাকে চিনতেই পারলেন না?’ কবি অপ্রস্তুত হয়ে সস্নেহে তাঁর গায়ে হাত রেখে বললেন? ‘সত্যি আমার পক্ষে তো এটা অন্যায়ই। তা, তুমি এখন কী করছ?’ ছাত্র উত্তর দিল, ‘আমি এখানকার ওসি।’ তারপর কবির কাছে সবকিছু জানতে চাইলেন। কবি তখন অফিসার এবং কনস্টেবলদের সব কথাই বললেন। সমস্ত শুনে ছেলেটি কবির দিকে ফিরে বলল, ‘আসুন স্যার আমার সঙ্গে।’ তিনি নিরাপদ স্থানে এসে কবিকে ট্রামে তুলে দিয়ে আবার ভক্তিভরে প্রণাম করে বললেন, ‘স্যার, আপনার অসম্মান করে ওরা যে আজ কতবড় অপরাধ করছে সেটা বুঝবার মত শক্তি হয়তো ওদের কোনদিনই হবে না। আমি আজ ওদের সকলের হয়ে বারবার আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি—।’
রাত্রে কবি যখন কথাগুলো বলেছিলেন, তখন লাবণ্য দাশের মনে হয়েছিল কবির মনটা যেন সেই ছেলেটির কাছেই চলে গিয়েছে। ছাত্রের এই মহানুভবতার কথা কবি কোনওদিনই ভোলেননি— ভুলতে পারেননি। সে রাতে তিনি নীরবে যে তাঁর সুখ, শান্তি এবং দীর্ঘজীবন কামনা করে বরাবর তাঁকে আশীর্বাদ জানাচ্ছিলেন।
কবি জীবনানন্দের এক লাইন কবিতা পাবার আশায় কলকাতা ল্যান্সডাউন রোড়ের বাড়িতে প্রতিদিন দলে দলে ছাত্রছাত্রী আসত। সকলে হাসিমুখেই ফিরে যেত। তাঁর স্ত্রী কিছু বললেই উত্তর দিতেন, ‘এরাই তো আমাদের ভবিষ্যতের আশা ভরসা। এদের ভিতর দিয়েই তো আমি বেঁচে থাকব। এদের কি ফেরাতে পারি?’ কোনো অনুষ্ঠানে কবি তাঁর স্বরচিত কবিতা পাঠ করলে ছাত্ররা মন্ত্রমুগ্ধের মত তা শুনতেন। তারপরের কারোর কবিতা শুনতে আর ছাত্রদলকে আটকে রাখা যেত না। তাই শনিবারের চিঠি পত্রিকার সম্পাদক ও সমালোচক সজনীকান্ত দাশ কবিকে বলেছিলেন, ‘আপনাকে প্রথমদিকে আবৃত্তি করতে দিয়ে শেষে আমি চেয়ার বেঞ্চ নিয়ে বসে থাকি।’ তিনি আরও বললেন, যে কবির কবিতা শোনার পরে ছাত্রদলকে কিছুতেই আর আটকে রাখা যাবে না।
কবির এই আন্তরিকতা এবং স্নেহের বিনিময়ে ছাত্র এবং ছাত্রসম অন্যান্য কিশোর এবং যুবকদের অন্তরতম প্রদেশে তাঁর আসন দৃঢ়ভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।