একটা সময় ছিল, যখন পৃথিবীর মানচিত্রে ভারতবর্ষকে কেবল একটি ভূখণ্ড হিসেবে দেখা হতো না; ভারতকে দেখা হতো জ্ঞানের এক অনিঃশেষ উৎস হিসেবে। সভ্যতার প্রাচীন ইতিহাস খুলে দেখলে আমরা আবিষ্কার করি, আজ থেকে বহু শতাব্দী আগে যখন ইউরোপের বহু দেশ আধুনিক শিক্ষার আলো স্পর্শই করেনি, তখন এই উপমহাদেশের বুকেই জ্বলে উঠেছিল নালন্দা, তক্ষশিলা, বিক্রমশিলার মতো মহাবিদ্যার অগ্নিশিখা। দূর চীন থেকে, কোরিয়া থেকে, আরব থেকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা অঞ্চল থেকে মানুষ জ্ঞান আহরণের জন্য ছুটে আসত এই ভারতভূমিতে। ভারত তখন ছিল বিশ্বমানবতার এক বিশ্ববিদ্যালয়।
সময়ের চাকা ঘুরেছে। ইতিহাস বহুবার তার পোশাক বদলেছে। আজ সেই ভারতবর্ষের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য আমাদের চোখে পড়ে। যে দেশ একদিন পৃথিবীকে জ্ঞান দিয়েছিল, সেই দেশেরই লক্ষ-লক্ষ মেধাবী তরুণ আজ নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য দেশ ছেড়ে পাড়ি দিচ্ছে বিদেশে। এই ঘটনাকে আমরা নাম দিয়েছি— ‘ব্রেন ড্রেন’ বা প্রতিভা-পলায়ন। শব্দটি শুনতে হয়তো খুব আধুনিক, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি জাতির নীরব ক্ষয়।
একটি শিশুর জন্মের পর থেকে তাকে মানুষ করে তোলার পেছনে একটি রাষ্ট্রের কতখানি বিনিয়োগ থাকে, আমরা কি কখনও তা ভেবে দেখি? সরকারি বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি শিক্ষা কেন্দ্র, চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান— সর্বত্র কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো গড়ে ওঠে। বিশেষত দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলি— আইআইটি, আইআইএম, এইমস কিংবা জাতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে একজন শিক্ষার্থীকে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা দিতে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। অথচ শিক্ষা সম্পূর্ণ হওয়ার পর যখন সেই তরুণ-তরুণীর বড় অংশ বিদেশের মোটা বেতন, উন্নত জীবনযাত্রা কিংবা গবেষণার উন্নত পরিকাঠামোর টানে স্থায়ীভাবে অন্য দেশের নাগরিক হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন জাগে— এই বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল কে পেল? ভারত, না অন্য কোনো উন্নত অর্থনীতি?
গত এক দশকের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। প্রতি বছর কয়েক লক্ষ ভারতীয় ছাত্র উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর এখন যেন ভারতীয় মেধার নতুন ঠিকানা। শুধু ছাত্র নয়, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ— অসংখ্য দক্ষ ভারতীয় বিশ্বের নানা দেশে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। শুনতে গর্বের মনে হলেও এর অন্তরালে রয়েছে এক অস্বস্তিকর সত্য— আমাদের নিজেদের উন্নয়নের জন্য যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারা ধীরে-ধীরে অন্য দেশের শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।
অবশ্য বিষয়টির অন্য একটি দিকও আছে।
বিদেশে থাকা ভারতীয়রা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান। সেই অর্থ দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়। কোটি-কোটি পরিবার তার ওপর নির্ভর করে জীবন চালায়। কিন্তু অর্থনীতির প্রশ্ন সবসময় টাকার অঙ্কে মাপা যায় না। একটি দেশ কেবল বিদেশি মুদ্রা দিয়ে বড় হয় না; দেশ বড় হয় গবেষণা দিয়ে, আবিষ্কার দিয়ে, প্রযুক্তি দিয়ে, শিল্পোন্নয়ন দিয়ে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে। যদি এই একই প্রতিভা দেশের ভেতরেই কাজ করত, তাহলে হয়তো ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার গতি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেত।
এই কারণেই আজ সময় এসেছে ‘ব্রেন ড্রেন’ কথাটিকে বদলে ‘ব্রেন গেইন’-এর কথা বলার। অর্থাৎ এমন এক ভারত নির্মাণ করা, যেখানে সারা পৃথিবীর মেধাবীরা আসতে চাইবে; যেখানে ভারতীয় তরুণরা বিদেশে যাওয়াকে বাধ্যতা হিসেবে দেখবে না।সরকার অবশ্য ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ‘স্টাডি ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যাতে বিদেশি শিক্ষার্থীরা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হয়। বিভিন্ন এশীয় দেশের গবেষকদের জন্য পিএইচডি বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদেশি ছাত্রদের ভিসা, ভর্তি এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর প্রচেষ্টাও চলছে। উদ্দেশ্য স্পষ্ট— ভারতকে আবার বিশ্বশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু বাস্তবের মাটিতে এখনও বহু বাধা। বিদেশি ছাত্ররা অভিযোগ করেন— প্রশাসনিক জটিলতা, দূষণ, অত্যধিক উষ্ণ আবহাওয়া, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগারের অভাব, এবং ভারতীয় ডিগ্রির সীমিত বৈশ্বিক স্বীকৃতি। অন্যদিকে ভারতীয় মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যে এমন এক মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়েছে, যেখানে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি যেন সাফল্যের একমাত্র প্রতীক। ফলে দেশেই তুলনামূলক কম খরচে ভালো শিক্ষা পাওয়া সম্ভব হলেও বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা
কমছে না।
এখানেই মূল প্রশ্ন— আমরা কি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছি, যা কেবল ডিগ্রি দেয় না, স্বপ্নও দেয়? এমন বিশ্ববিদ্যালয় কি গড়তে পেরেছি, যেখানে গবেষক মনে করবে তার ভবিষ্যৎ এই দেশেই নিরাপদ? এমন শিল্পনীতি কি তৈরি হয়েছে, যেখানে একজন তরুণ উদ্ভাবক নিজের মেধাকে দেশেই কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে?আজ ভারতের প্রয়োজন আরও বেশি গবেষণা কেন্দ্র, আরও উন্নতমানের বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প ও শিক্ষার মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ এবং এমন এক পরিবেশ যেখানে তরুণেরা চাকরিপ্রার্থী না হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হয়ে উঠবে। শিক্ষা তখনই সফল, যখন তা মানুষকে শুধু পরীক্ষায় পাশ করায় না, সমাজ বদলানোর শক্তি যোগায়।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীও দেশের অর্থ বাইরে চলে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি দেশীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ‘ওয়েড ইন ইন্ডিয়া’ বা দেশের ভেতরেই বড় সামাজিক অনুষ্ঠান করার আহ্বান জানিয়েছেন। ভাবনাটা কেবল বিয়ে নিয়ে নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বৃহত্তর অর্থনৈতিক দর্শন— দেশের সম্পদ যেন দেশের মধ্যেই আবর্তিত হয়।ঠিক সেইভাবেই এখন প্রয়োজন ‘স্টাডি ইন ইন্ডিয়া’, ‘ওয়ার্ক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘ইনোভেট ইন ইন্ডিয়া’কে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করা। দেশের প্রতিভাবান তরুণদের এমন সুযোগ দিতে হবে, যাতে বিদেশ তাদের কাছে স্বপ্ন না হয়ে ওঠে, বরং ভারতই হয়ে ওঠে সম্ভাবনার বৃহত্তম ভূমি।
কারণ একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ সোনা নয়, তেল নয়, প্রাকৃতিক খনিজ নয়— প্রকৃত সম্পদ দেশের মানুষের মেধা। যে দেশ নিজের মেধাকে ধরে রাখতে পারে না, সে দেশ উন্নয়নের সিঁড়ি বেয়ে যতই ওপরে উঠুক, ভিতরে ভিতরে সে দেশ ক্রমশ ফাঁপালো হয়ে যেতে থাকে।
ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই একটি প্রশ্নের ওপর— আমরা কি আমাদের সন্তানদের এমন একটি দেশ দিতে পারব, যেখানে তারা পৃথিবী জয় করার স্বপ্ন দেখবে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করবে নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে? কারণ ইতিহাস সাক্ষী— যে দেশ প্রতিভাকে হারায়, সে দেশ পিছিয়ে পড়ে এবং যে দেশ প্রতিভাকে আহ্বান জানাতে শেখে, ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তারই হাতে লেখা হয়।