ইজরায়েলের নির্বাচনকে সাধারণত সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হলেও, এবারের নির্বাচনের গুরুত্ব তার চেয়ে অনেক বেশি। এই নির্বাচন শুধু বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই নয়, একই সঙ্গে ইজরায়েলের নিরাপত্তানীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং প্যালেস্টাইনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সে দেশের সমাজে জমে থাকা গভীর মতপার্থক্যেরও প্রতিফলন। কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটদানের হার সেই রাজনৈতিক গুরুত্বকেই সামনে এনেছে। কিন্তু বিপুল ভোটদানের অর্থ এই নয় যে, ইজরায়েল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে। বরং নির্বাচনের ফলাফল যদি কোনও পক্ষকেই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না দেয়, তাহলে নতুন করে জোটের সমীকরণ, দর-কষাকষি এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির দীর্ঘ পর্ব শুরু হতে পারে।
এবারের নির্বাচনে একদিকে রয়েছেন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিক নেতানিয়াহু, অন্যদিকে প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। আইজেনকটের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ইয়াশার পার্টিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মতাদর্শের বিরোধী দল একত্র হয়েছে। তাদের মধ্যে দক্ষিণপন্থী, মধ্যপন্থী ও বামঘেঁষা রাজনীতির প্রতিনিধিরা রয়েছেন। আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাঁদের প্রধান লক্ষ্য নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানো। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর ভরসা অতি-দক্ষিণপন্থী ও অতি-ধর্মীয় ইহুদি দলগুলির সমর্থন। ফলে নির্বাচনের লড়াইটি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পাশাপাশি দুটি পৃথক রাজনৈতিক শিবিরের ক্ষমতা ধরে রাখা অথবা ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের সংগ্রামেও পরিণত হয়েছে।
ইজরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের কারণে কোনও একটি দলের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা কঠিন। সরকার গড়তে পার্লামেন্টের ১২০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে ভোটের ফলাফলে কোনও দল এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের নিশ্চয়তা থাকে না। ছোট দলগুলির সমর্থন তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ব্যবস্থার একটি গণতান্ত্রিক দিক রয়েছে— বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। কিন্তু একই সঙ্গে ছোট দলগুলির হাতে অতিরিক্ত দর-কষাকষির ক্ষমতা চলে যেতে পারে। জনমতের বৃহত্তর চিত্রের সঙ্গে সরকারের নীতির ব্যবধানও তৈরি হতে পারে।
নেতানিয়াহুর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নিরাপত্তা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইজরায়েলে যে হামলা হয়েছিল, তাতে প্রায় ১২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে পণবন্দি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। ইজরায়েলের ইতিহাসে এই হামলা ছিল এক ভয়াবহ নিরাপত্তাজনিত বিপর্যয়। বিরোধীরা মনে করেন, এই ঘটনা দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতাকে প্রকাশ করেছে এবং তার রাজনৈতিক দায় নেতানিয়াহু এড়াতে পারেন না। তাঁরা হামলার কারণ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
নেতানিয়াহু অবশ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকেই প্রধান যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, আঞ্চলিক সংঘাত মোকাবিলা এবং ইজরায়েলের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব অপরিহার্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককেও তিনি নিজের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখাতে চান। কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করলেই যে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, এমন নিশ্চয়তা নেই। ৭ অক্টোবরের হামলা সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা কীভাবে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা ইজরায়েলের নাগরিকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
নির্বাচনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে, যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে তাঁর সরকারের উদ্যোগ অতীতে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিল। বিরোধীদের আশঙ্কা, এই ধরনের সংস্কার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে দুর্বল করতে পারে। অন্যদিকে সরকারের সমর্থকদের একাংশের বক্তব্য, নির্বাচিত সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা থাকা উচিত এবং বিচার বিভাগের ক্ষমতারও সীমা থাকা প্রয়োজন।
এই বিতর্কের মীমাংসা কেবল একটি নির্বাচনের ফলাফলের উপর নির্ভর করে না। গণতন্ত্রের শক্তি শুধু নিয়মিত ভোটগ্রহণে নয়; স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতার মধ্যেও তার ভিত্তি নিহিত। কোনও সরকার নিরাপত্তা বা জাতীয় স্বার্থের যুক্তি দেখিয়ে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে চাইলে সেই পদক্ষেপের সাংবিধানিক সীমা ও জনস্বার্থের প্রশ্ন বিবেচনা করা জরুরি।
ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্কও এবারের নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ইজরায়েলের অতি-ধর্মীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের বহু পুরুষ পূর্ণকালীন ধর্মীয় শিক্ষায় যুক্ত থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক পরিষেবা থেকে ছাড় পেয়ে এসেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলিতে যখন বিপুলসংখ্যক সাধারণ নাগরিক ও সংরক্ষিত বাহিনীর সদস্যকে সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে, তখন এই ছাড়ের প্রশ্নে অসন্তোষ বেড়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কার্যকর না হওয়ায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। একদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, অন্যদিকে রাষ্ট্রের প্রতি সমান দায়িত্ব— এই দুইয়ের মধ্যে
ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা পরবর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তবে ইজরায়েলের রাজনীতির সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন প্যালেস্টাইন। গাজায় যুদ্ধের মানবিক মূল্য, বিপুল প্রাণহানি এবং আন্তর্জাতিক মহলে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা সমালোচনা ইজরায়েলের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইজরায়েলি সামরিক অভিযানে ৭৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এই হিসাব হামাস-পরিচালিত প্রশাসনের কাছ থেকে এলেও রাষ্ট্রসঙ্ঘ একে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করেছে। প্রতিদিনের সামরিক সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকটের মধ্যে শান্তির সম্ভাবনা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে।
আইজেনকট গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর পক্ষে এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের কথাও বলেছেন। পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি বসতি স্থাপনের প্রশ্নেও তাঁর অবস্থান প্যালেস্টাইনিদের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইজরায়েলি বসতিগুলি অবৈধ। একই সঙ্গে সেখানে উগ্র ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের হামলা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্যালেস্টাইনিদের জন্য সীমিত স্বায়ত্তশাসন বা রাষ্ট্রসদৃশ কোনও ব্যবস্থা তৈরির কথা উঠলেও, তার উপর ইজরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ধারণা স্বাধীন প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
আরব নাগরিকদের ভোটও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ইজরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব, তাঁদের অনেকেই নিজেদের প্যালেস্টাইনি বংশোদ্ভূত ইজরায়েলি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। সংখ্যার বিচারে আরব দলগুলি সরকার গঠনের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু প্রধান ইহুদি দলগুলির অধিকাংশই তাদের সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে। ফলে নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্ব থাকলেও সেই প্রতিনিধিত্ব সরকার পরিচালনায় কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচনের ফলাফল যে দিকেই যাক, ইজরায়েলের সামনে সমস্যার তালিকা দীর্ঘ। নেতানিয়াহু ক্ষমতায় ফিরলে তাঁর জোটের শরিকদের দাবি মেনে চলতে হবে। বিরোধী জোট সরকার গড়লেও নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা, ধর্মীয় ছাড় এবং প্যালেস্টাইন নীতি নিয়ে মতপার্থক্য সামলাতে হবে। কোনও পক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হতে পারে। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পাঁচটি নির্বাচন ইজরায়েলকে যে অস্থিরতার অভিজ্ঞতা দিয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তিও অসম্ভব নয়।
অতএব, ইজরায়েলের এই নির্বাচনকে কেবল নেতানিয়াহু বনাম আইজেনকটের লড়াই হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত তাৎপর্য ধরা পড়বে না। প্রশ্নটি আরও গভীর— নিরাপত্তা কি শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব, নাকি তার জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রশাসন, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানও? ভোটের ফলাফল সাময়িকভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে পারে। কিন্তু ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইনের মানুষের জন্য স্থায়ী নিরাপত্তা এবং শান্তির পথ তৈরি করতে হলে নির্বাচনী জয়ের বাইরে গিয়ে এই মৌলিক প্রশ্নগুলির মুখোমুখি হতেই হবে।