ইজরায়েলের নির্বাচন সে দেশের রাজনীতিতে স্পষ্ট সমাধান আনতে পারেনি

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

ইজরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচন সে দেশের রাজনীতিতে কোনও স্পষ্ট সমাধান এনে দিতে পারেনি। নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন দক্ষিণপন্থী জোট এগিয়ে থাকলেও সরকার গড়ার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের হাতে নেই। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরও বিকল্প সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে পারেনি। ফলে নেতানিয়াহু আপাতত বড় রাজনৈতিক বিপদ থেকে রক্ষা পেলেও একে তাঁর বিজয় বলা যায় না। বরং এই ফলাফল ইজরায়েলের রাজনীতিতে গভীর অনিশ্চয়তা এবং বিভাজনের ছবিটিই সামনে এনেছে।

প্রশ্ন হল, ইজরায়েলের মানুষ আসলে কী চান? তাঁরা কি নিরাপত্তার স্বার্থে পুরনো নেতৃত্বের উপরেই আস্থা রাখতে চান, নাকি গত কয়েক বছরের ব্যর্থতার জন্য সরকারের জবাবদিহি দাবি করেন? ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইজরায়েলে যে ভয়াবহ হামলা হয়েছিল, তা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়ার কথা। এত বড় হামলা কীভাবে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে গেল, সেই প্রশ্ন আজও গুরুত্বপূর্ণ। যে সরকারের প্রধান দাবি ছিল দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেই সরকারের আমলেই এমন বিপর্যয় ঘটল। স্বাভাবিকভাবেই নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল।

এরপর গাজা-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনা, বিপুল প্রাণহানি, আন্তর্জাতিক মহলে ইজরায়েলের ভাবমূর্তির অবনতি এবং রাজনৈতিক দায় স্বীকার করতে নেতানিয়াহুর অনীহা— সবই তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রধান অস্ত্র হয়েছে। তা সত্ত্বেও তাঁর সমর্থন যে পুরোপুরি কমেনি, তার কারণও বুঝতে হবে। ইজরায়েলের মানুষের একাংশের কাছে দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নটি অন্য সব রাজনৈতিক প্রশ্নের চেয়ে বড়। চারপাশে শত্রু রাষ্ট্র ও সশস্ত্র সংগঠনের উপস্থিতি, ভবিষ্যৎ হামলার আশঙ্কা এবং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতা তাঁদের মনে ভয় তৈরি করেছে। এই ভয়ই অনেক সময় সরকারের ব্যর্থতার প্রশ্নকে পিছনে ঠেলে দেয়।


এই নির্বাচনে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ইজরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের ভোটদানের হার বৃদ্ধি এবং সংসদে প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর চেষ্টা প্রমাণ করে, তাঁরা আর শুধু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হয়ে থাকতে চান না। অপরাধ, আবাসন, শিক্ষা এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো সমস্যার সমাধান তাঁদের প্রধান দাবি। কিন্তু তাঁদের রাজনৈতিক শক্তি তখনই কার্যকর হবে, যখন ইহুদি বিরোধী দলগুলি তাঁদের সঙ্গে সহযোগিতায় রাজি হবে।

এখানেই বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের সামনে বড় পরীক্ষা। তিনি নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে নিজেকে তুলে ধরলেও আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলির সঙ্গে জোট গড়তে দ্বিধা দেখিয়েছেন। দক্ষিণপন্থী ইহুদি ভোটারদের অসন্তুষ্ট করার আশঙ্কা হয়তো এর কারণ। কিন্তু আরব দলগুলির সমর্থন ছাড়া সরকার গঠনের পথ কঠিন হলে এই অনীহা শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুকেই সুবিধা করে দিতে পারে। গণতন্ত্রে নাগরিকের ভোটের মূল্য তাঁর ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে না।

ইজরায়েলের সংসদে মোট আসন ১২০টি। সরকার গড়তে প্রয়োজন ৬১টি আসন। এই আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থায় ছোট দলগুলিও অনেক সময় বড় ভূমিকা নেয়। নেতানিয়াহুকে অতি-ধর্মীয় ও কট্টর দক্ষিণপন্থী দলগুলির উপর নির্ভর করতে হয়। অন্যদিকে, বিরোধীদের মধ্যেও নিরাপত্তা নীতি এবং আরব দলগুলির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান এবং জাতীয় দায়িত্বের সমান বণ্টন নিয়ে বিরোধ বাড়ছে।

ফলে আবার নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু বারবার নির্বাচন কোনও দেশের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। ইজরায়েলের আজ প্রয়োজন শুধু নতুন সরকার নয়, একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি। নিরাপত্তা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি সরকারের জবাবদিহি, নাগরিকের সমান অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক মর্যাদা।

নেতানিয়াহু ক্ষমতায় টিকে থাকলেন কি না, সেটাই এই নির্বাচনের একমাত্র বিচার্য বিষয় নয়। আসল প্রশ্ন, ইজরায়েল কি নিজের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে প্রস্তুত?