ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করলে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক দৃঢ়চেতা মানুষের মুখ— যাঁর হাতে ছিল বই, মনে ছিল যুক্তি, আর হৃদয়ে ছিল মানুষের জন্য অফুরন্ত মমতা। উনিশ শতকের অন্ধকারাচ্ছন্ন বাংলায় তিনি যেন এক প্রদীপ হাতে এগিয়ে এসেছিলেন। সেই প্রদীপের আলো শুধু সমাজসংস্কারের পথে নয়, শিক্ষার পথেও ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল না নিছক পরীক্ষায় ভালো ফল করার উপায়, শিক্ষা ছিল মানুষ হয়ে ওঠার সাধনা।
১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুরের (তৎকালীন হুগলি জেলার) বীরসিংহ গ্রামে জন্মেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। দারিদ্র্য ছিল তাঁর শৈশবের নিত্যসঙ্গী। গ্রামের পাঠশালা থেকে শুরু করে কলকাতার সংস্কৃত কলেজ— দীর্ঘ ও কঠিন শিক্ষাযাত্রায় নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। অল্প বয়সেই ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি। কিন্তু তাঁর প্রকৃত মহত্ত্ব শুধু পাণ্ডিত্যে নয়; অর্জিত জ্ঞানকে তিনি সমাজের কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে কর্মজীবন এবং পরে সংস্কৃত কলেজের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক তাঁর শিক্ষাচিন্তাকে নতুন মাত্রা দেয়। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল প্রাচীন শাস্ত্রের পাণ্ডিত্য দিয়ে নতুন যুগের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। শিক্ষার জানালা খুলে দিতে হবে পৃথিবীর দিকে। তাই সংস্কৃতের পাশাপাশি ইংরেজি ও বাংলা ভাষা, ইতিহাস, গণিত, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ের ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে ছাত্র শুধু মুখস্থ করবে না— জানবে, প্রশ্ন করবে, বিচার করবে এবং নিজের বুদ্ধি দিয়ে সত্যকে চিনে নেবে।
এইখানেই বিদ্যাসাগরের শিক্ষাভাবনার আধুনিকতা। তিনি প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানকে অস্বীকার করেননি, আবার প্রাচীনতার নামে ভুলকে আঁকড়েও থাকেননি। পাশ্চাত্য জ্ঞানকেও তিনি গ্রহণ করেছিলেন বিচারবুদ্ধির আলোয়। অর্থাৎ তাঁর কাছে শিক্ষার দরজা কোনো একটি মত, কোনো একটি যুগ বা কোনো একটি সংস্কৃতির দিকে বন্ধ ছিল না। জ্ঞান যেখানে, সত্য যেখানে— সেখানেই তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন পৌঁছতে চেয়েছে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম বড় পদক্ষেপ ছিল সংস্কৃত কলেজের দরজা অন্যান্য জাতির ছাত্রদের জন্য খুলে দেওয়া। জ্ঞানকে তিনি কোনো বিশেষ বর্ণ বা সম্প্রদায়ের সম্পত্তি বলে মনে করেননি। শিক্ষার অধিকার মানুষের অধিকার— এই সহজ অথচ বিপ্লবী সত্যটি তিনি কাজে প্রমাণ করেছিলেন। ছাত্রদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের কথাও তিনি ভেবেছিলেন। শিক্ষক তৈরির জন্য নর্মাল স্কুল প্রতিষ্ঠা, শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ— সবকিছুর মধ্যেই ছিল
তাঁর বাস্তববোধ।
বাংলা ভাষার প্রতিও তাঁর ঋণ অসীম। তিনি জানতেন, যে শিক্ষা মানুষের নিজের ভাষায় পৌঁছয় না, তা বৃহত্তর সমাজে শিকড় গাড়তে পারে না। তাই মাতৃভাষাকে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম করার জন্য তিনি নিরলস চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর বর্ণপরিচয় শুধু শিশুদের অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার বই নয়; বাংলা ভাষায় সহজ, স্বচ্ছ ও সুন্দর শিক্ষাদানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কঠিন বিষয়কে সহজ করে বলার এই ক্ষমতাই তাঁকে একই সঙ্গে শিক্ষাবিদ ও ভাষাশিল্পী করে তুলেছিল। নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর সংগ্রাম ছিল আরও কঠিন। যে সমাজে মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানোকে অনেকেই অপ্রয়োজনীয়, এমনকি বিপজ্জনক বলে মনে করত, সেই সমাজের বুকেই বিদ্যাসাগর বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজে নেমেছিলেন। অভিভাবকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝানো, বিদ্যালয়কে আর্থিক সাহায্য করা, সরকারের কাছে সহায়তা চাওয়া— কোনো পথই তিনি এড়িয়ে যাননি। তাঁর উপলব্ধি ছিল স্পষ্ট— সমাজের অর্ধেক মানুষকে অশিক্ষার অন্ধকারে রেখে কোনও জাতি সত্যিকার অর্থে আলোকিত হতে পারে না।
গণশিক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর দৃষ্টি ছিল বিস্তৃত। শিক্ষা যেন শুধু কলকাতার অভিজাত সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, গ্রামের সাধারণ মানুষের ঘরেও তার আলো পৌঁছয়— এই ছিল তাঁর আকাঙ্ক্ষা। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তারই প্রমাণ। পরে দেশীয় পরিচালনায় উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনের বিকাশ তাঁর সেই স্বপ্নেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি।