দেশে ধর্ম-সংস্কৃতির বৈচিত্র্য কি অসহনীয় হয়ে উঠছে?

একটি রাজনৈতিক সমাবেশের ফাইল চিত্র।

শতদল ভট্টাচার্য

ভারতবর্ষ বহু শতাব্দী ধরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানে নানা ধর্ম, মত, বিশ্বাস ও উপাসনা-পদ্ধতি পাশাপাশি সহাবস্থান করে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের উপর বারবার আঘাত আসছে, যা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। সদ্য অতিক্রান্ত ২০২৫ সালের খ্রিস্টিয় উৎসবের মরশুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খ্রিস্টোৎসবকে কেন্দ্র করে যে অশান্তি ও হিংসার ঘটনা ঘটেছে, তা আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। খবরের পাতায় উঠে এসেছে, কিছু মানুষ পরিকল্পিতভাবে গির্জা ও বড়দিনের অনুষ্ঠানকে লক্ষ্য করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। এই ধরনের ঘটনা একেবারে নতুন নয়, আগেও ঘটেছে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে এই প্রবণতা বাড়তে থাকায় বিষয়টি আর বিচ্ছিন্ন বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যারা ভারতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন, তাঁদের কাছে এই সব ঘটনা অত্যন্ত অশুভ ইঙ্গিত বহন করে। ভারতবর্ষ কখনও এমন ছিল না, এমন হওয়ার কথাও ছিল না।

ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে সমান ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে যে কোনও ধর্মীয় উৎসব পালন করার অধিকার সকলের রয়েছে। সেই অধিকার খর্ব করার চেষ্টা কেবল অসভ্যতা নয়, তা সংবিধানবিরোধীও বটে। খ্রিস্টান উপাসনাস্থল বা উৎসবমণ্ডপে অকারণে আক্রমণ চালিয়ে সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করা একেবারেই বর্বরতা। এতে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় না, বরং বিশ্বদরবারে ভারতকে সংকীর্ণ ও অসহিষ্ণু রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে। প্রশ্ন উঠছে, কোনও কারণ ছাড়াই খ্রিস্টান সমাজকে কেন এভাবে উত্যক্ত করা হচ্ছে? এর দ্বারা দেশের বা সমাজের কী উপকার হচ্ছে? যারা এই হামলা চালাচ্ছে, তারা কোন যুক্তিতে নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতির একমাত্র রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে? প্রকৃত ভারতীয় জীবনদর্শন, হিন্দু সংস্কৃতির গভীর ঐতিহ্য কিংবা আধ্যাত্মিক চিন্তার সঙ্গে এই হিংস্রতার কোনও সম্পর্ক নেই। হিন্দু দর্শনের মর্মস্থল থেকেই তো সহনশীলতা, করুণা ও বহুত্ববাদের শিক্ষা এসেছে। ভারতের ইতিহাস স্মরণ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও স্বামী বিবেকানন্দ— এই তিনজনই হিন্দু সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি, অথচ তাঁরা যীশুর খ্রিস্টর জীবন ও দর্শনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর জীবনেও যীশুর প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। রামকৃষ্ণ পরমহংসের ঘরেও যীশুর ছবি স্থান পেয়েছিল। এই মহাপুরুষদের দেখানো পথ ধরেই আধুনিক ভারতীয় সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সেই ঐতিহ্যের ধারক-বাহক সমাজ কি আজ খ্রিস্টবিদ্বেষকে প্রশ্রয় দিতে পারে?


আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় দেখা গিয়েছে, গির্জায় উপস্থিত হিন্দু দর্শনার্থীদেরও আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। আক্রমণকারীদের প্রশ্ন ছিল—‘হিন্দুরা কেন গির্জায় যাবে?’ এর অর্থ দাঁড়ায়, কেবল খ্রিস্টানদের নয়, হিন্দুদের ব্যক্তিস্বাধীনতাও খর্ব করা হচ্ছে। কে কোথায় যাবে, কাকে শ্রদ্ধা করবে— এ সব কি বাহুবলীদের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হবে? ভারতে বড়দিন কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বহুদিন ধরেই সর্বজনীন আনন্দোৎসবের রূপ নিয়েছে। যীশুর মানবিক বাণী ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমানবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সেই স্মৃতির অবমাননা ভারতীয় সংস্কৃতিতে কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই কারণে কেবল খ্রিস্টান সমাজ নয়, সমস্ত সচেতন ভারতবাসীকেই এই বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। এই সব ঘটনার পেছনে যে শক্তি কাজ করছে, তাদের সাহস ও প্রশ্রয় কোথা থেকে আসছে, সে প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা করতে গেলে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রশ্রয় প্রয়োজন হয়। দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না হলে এই ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে। আমরা কোনওভাবেই চাই না ভারত অশান্তি ও ধর্মীয় বিদ্বেষে জর্জরিত কোনও রাষ্ট্রে পরিণত হোক। এই প্রেক্ষাপটে সংবিধানের আর্টিকল ৫১ বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। সেখানে নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য হিসেবে সামাজিক সৌহার্দ্য বজায় রাখা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং ভ্রাতৃত্ববোধের বিকাশের কথা বলা হয়েছে। এগুলি কাগুজে আদর্শ নয়, এগুলি উপেক্ষা করলে দেশ ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।

ধর্মের নামে উগ্রতা ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যায় না। রামায়ণ-মহাভারত, বেদান্ত, বুদ্ধ-মহাবীর কিংবা নানক-কবীর-চৈতন্য— সকলেই মানবিকতা ও সহিষ্ণুতার কথা বলেছেন। সেই দেশে আজ ধর্মের নামে হিংসা কেন মাথাচাড়া দিচ্ছে, তা গভীর আত্মসমালোচনার বিষয়।সবশেষে বলা প্রয়োজন, শীতকালীন উৎসবের সময় সমাজে যদি কোনও অপসংস্কৃতির বিরোধিতা করা জরুরি হয়, তবে তা ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের নামে অসংযত উচ্ছৃঙ্খলতা। মদ্যপান, হুল্লোড় ও বিশৃঙ্খলার যে প্রবণতা বাড়ছে, তা কোনও সভ্য সমাজের লক্ষণ নয়। এই অপসংস্কৃতি কোনও এক সম্প্রদায়ের নয়, এটি সর্বজনীন সমস্যা। ধর্মীয় সহনশীলতার পাশাপাশি সামাজিক শালীনতাও রক্ষা করা জরুরি।

ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরের উপর— আমরা কি বহুত্ববাদী, মানবিক ও উদার ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে পারব,না কি বিদ্বেষ ও সংকীর্ণতার পথে এগোব?
সিদ্ধান্ত আমাদেরই।

আমার মনে হয় দেশে সংবিধানের সেই অংশটির চর্চা বেশি হওয়া দরকার যেখানে নাগরিকের মৌলিক কর্তব্যগুলো লিপিবদ্ধ আছে। আর্টিকল ৫১-এ বিশেষ মনোযোগ সহকারে দ্রষ্টব্য। দেশে সামাজিক সৌষম্য বজায় রাখা প্রতি নাগরিকের কর্তব্য। ধর্মীয়, ভাষাগত, আঞ্চলিক বা গোষ্ঠীগত বিভেদকে অতিক্রম করে সমাজে এক সার্বিক ভ্রাতৃত্ববোধের বিকশন নাগরিকের কর্তব্য। দেশের মিশ্র সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও বিকাশ করাও নাগরিকের কর্তব্য। সংবিধানের এই অনুজ্ঞাগুলি কোনো আজগুবি প্রস্তাব নয়। এর বিপরীত কাজ করলে দেশ অন্ধকারেই ডুবে যাবে, নতুবা অশান্তির আগুনে জ্বলতে জ্বলতে ছাই হতে থাকবে। আমরা নিশ্চয়ই চাইব না ভারত কালে কালে সিরিয়া বা লেবানন বা গাজায় কিংবা আফগানিস্তানে রূপান্তরিত হোক। অথবা পাকিস্তানের মতো অনুদার ও কূপমণ্ডুক সমাজের এক প্রতিবিম্ব ভারতে কায়েম হবে একথা আমরা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারি না।
যে পুণ্যাত্মা যীশুকে তাঁর উদার মুক্তচিন্তার জন্য দৈহিকভাবে নিগ্রহ করে ক্রুশে বিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল আজ থেকে দু-সহস্র বৎসর আগে, তাঁর স্মৃতিতে উদযাপিত অনুষ্ঠান বা উৎসব পণ্ড করার দরকার পড়ে কেন? কারণ তো সেই একই। যারা চিন্তার মুক্তি পছন্দ করে না তারাই এমনটা করে। গোঁড়ামি, কুসংস্কার, সঙ্কীর্ণচিত্ততা যারা পুষে রাখে তারাই এসব করে। তারাই তখনও এটা করেছিল, এখনো এটা করে। উদ্দেশ্য একটাই, মানবের স্বাধীনচিন্তার অস্তিত্বনাশ করা আর মানুষকে বদ্ধ করে রাখা। কিন্তু আজ এটা হতে দেওয়া চলবে না। আজকের ভারতকে পেছনের দিকে মুখ করে চলতে আমরা কিছুতেই দেব না। সামনে মুখ করে এগিয়ে চলার পথে আধ্যাত্মিকতার সাধনার সুন্দর সৌম্য বিকাশ হোক দেশে, কিন্তু ধর্মবাদী হুঙ্কার স্তব্ধ হোক, এটাই চাই।

যদি এই শীতকালীন উৎসবের দিনগুলিতে আজকের ভারতীয় সমাজে কোনও বিজাতীয়, বিকারগ্রস্ত কুসংস্কৃতির বিরোধিতা করার দরকার থাকে তা হল ইংরেজি নববর্ষ বরণের উপলক্ষে অসংযত ও বিকৃত উল্লাসের আতিশয্য। বছরের পর বছর ধরে ‘নিউ ইয়ার’ পালনের নামে অনিয়ন্ত্রিত হুল্লোড়, মদ্যপান, উচ্ছৃঙ্খলতা ও শোরগোলের এক চিৎকৃত অনুশীলন আজকের ভারতে বিভিন্ন সামাজিক স্তরে এমন ভাবে জাঁকিয়ে বসেছে যে, সমাজে সুভদ্র আনন্দোৎসবের বদলে এক উগ্র ও স্থূল অপসংস্কৃতির প্রভাব প্রকট হয়েছে। সামাজিক সংস্কৃতি নিয়ে কিছুমাত্র চিন্তা থাকলে এই উৎকট অপসংস্কৃতির সংশোধন নিয়ে সচেষ্ট হওয়া উচিত। আর মনে রাখতে হবে, এই ধরণের উৎকট ইংরেজি নববর্ষ পালনের অভ্যাস আজ সর্বজনীন, শুধু কোনো একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের নয়।