নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি শুধু কাগজেই ?

দিল্লির পথে ফের এক নৃশংস অপরাধ। ১৬ বছরের এক কিশোরী, একাদশ শ্রেণির ছাত্রী, বৃষ্টিভেজা রাতে বাসে উঠেছিল নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছবে বলে। কিন্তু সেই বাসই তার কাছে হয়ে উঠল আতঙ্ক ও নির্যাতনের স্থান। অভিযোগ, বাসের চালক ও কন্ডাক্টর তাকে গণধর্ষণ করে গভীর রাতে পুরনো দিল্লির কাশ্মীরি গেটের কাছে ফেলে রেখে যায়। পরে পুলিশ দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। তদন্ত চলছে। আইনের পথে তাদের বিচারও হবে। কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল— একটি মেয়েকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার মতো একটি সাধারণ প্রত্যাশাও কি আমাদের সমাজে আজ অতিরিক্ত হয়ে উঠেছে?
ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক, কারণ মেয়েটির বয়স মাত্র ১৬ বছর। সে কোনও অপরাধ করেনি। মায়ের সঙ্গে অভিমান করে বা পড়াশোনা নিয়ে বকুনি খেয়ে বাড়ির কাউকে না জানিয়ে সে আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়েছিল। ভুল করে গ্রেটার নয়ডার পরিচিত গন্তব্যের বদলে অন্য জায়গায় নেমে পড়েছিল। প্রবল বৃষ্টি ও অন্ধকারের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে থাকা একটি কিশোরীকে সাহায্য করার বদলে বাসের চালক ও কন্ডাক্টর তার অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়েছে— অভিযোগটি যদি প্রমাণিত হয়, তবে এর চেয়ে ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতা আর কী হতে পারে?
এই ঘটনা শুধু একটি ধর্ষণের ঘটনা নয়। এটি আমাদের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি। একটি গণপরিবহনের গাড়িতে কীভাবে এমন অপরাধ ঘটতে পারে? বাসটির জানালায় ভারী পর্দা ছিল বলে জানা যাচ্ছে। বাসে কোনও যাত্রীও ছিল না। প্রশ্ন উঠবেই— গাড়িটির নজরদারি ব্যবস্থা কোথায় ছিল? চালক ও কন্ডাক্টরের পরিচয় ও গতিবিধির উপর কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছিল? জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্য চাওয়ার ব্যবস্থা কি কার্যকর ছিল?
২০১২ সালের সেই ভয়াবহ দিল্লি গণধর্ষণের কথা আজও মানুষ ভুলতে পারেনি। চলন্ত বাসে ২৩ বছরের এক তরুণীর উপর যে বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা শুধু দিল্লি নয়, গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ‘নির্ভয়া কাণ্ড’ হিসেবে পরিচিত সেই ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল অগণিত মানুষ। নারীর নিরাপত্তা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা হয়েছিল। আইন বদলেছিল, কঠোর শাস্তির দাবি উঠেছিল, গণপরিবহনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
সেই ঘটনার পর একের পর এক বছর কেটে গেছে। কিন্তু আজও যদি একটি
১৬ বছরের মেয়ে বাসে উঠে নিরাপদ না থাকে, তাহলে আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করতে হবে— আমরা আসলে কতটা বদলেছি?
বাণিজ্যিক যানবাহনে এখন প্যানিক বাটন, গাড়ির অবস্থান জানানোর ব্যবস্থা এবং নজরদারির মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু শুধু নিয়ম তৈরি করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। নিয়ম কার্যকর হচ্ছে কি না, তার নিয়মিত পরীক্ষা দরকার। প্রতিটি বাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সত্যিই চালু আছে কি না, চালক ও কর্মীদের অতীত ও আচরণ যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না, রাতের যাত্রাপথে নজরদারি রয়েছে কি না— এসব প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনকে দিতে হবে।
তবে শুধু পুলিশ বা প্রশাসনকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নারীর প্রতি সম্মান ও মানবিকতার শিক্ষা পরিবার, সমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একটি মেয়ে কোথায় যাচ্ছে, কখন ফিরছে— এই প্রশ্নের পাশাপাশি তাকে নিরাপদে চলাফেরা করার অধিকারও দিতে হবে। কোনও মেয়ের অসহায় অবস্থাকে নিজের সুযোগ হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলানোই সবচেয়ে জরুরি।
এই কিশোরীর জীবনে যে মানসিক ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা কোনও আদালতের রায়ে সহজে মুছে যাবে না। তার শরীরের আঘাত হয়তো একদিন সেরে উঠবে, কিন্তু সেই রাতের আতঙ্ক, অপমান এবং নিরাপত্তাহীনতার স্মৃতি তাকে দীর্ঘদিন তাড়া করতে পারে। তাই তদন্ত ও বিচার যেমন দ্রুত ও নিরপেক্ষ হওয়া দরকার, তেমনই তার এবং তার পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক সহায়তাও জরুরি।
২০১২-র পর আমরা বলেছিলাম— আর নয়। কিন্তু এত বছর পরও যদি একই শহরে একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে সেই প্রতিশ্রুতির মূল্য কোথায়? শুধু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে কোনও কিশোরী রাতের অন্ধকারে বাসে উঠে সাহায্যপ্রার্থী হলে তার পাশে দাঁড়াবে মানুষ, তাকে শিকার বানাবে না।
দিল্লির এই ঘটনা তাই শুধু একটি পরিবারের বেদনা নয়। এটি আমাদের সকলের বিবেকের পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরও যদি আমরা শুধু কয়েক দিনের ক্ষোভে থেমে যাই, তবে আগামী দিনে আরও কোনও মেয়েকে একই আতঙ্কের মুখোমুখি হতে হবে। নিরাপত্তা কোনও সরকারি স্লোগান নয়, এটি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায় আমাদের সবার।