ইরানের রাস্তায় আজ যে রক্ত ঝরছে, তা কোনও বিচ্ছিন্ন অস্থিরতার ফল নয়, এ এক দীর্ঘদিনের জমে ওঠা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। সরকারি ও বেসরকারি নানা সূত্র মিলিয়ে গণবিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা প্রায় ২৫০০। সেই সঙ্গে ২৬ বছরের এক যুবকের ফাঁসির সাজা ঘোষণা যেন স্পষ্ট করে দিল, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের আর প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে নয়, শত্রু হিসেবেই দেখতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছেই, এই বিস্ফোরণের জন্য দায়ী কে? ইরান সরকার বলছে, আমেরিকা ও ইজরায়েলের ষড়যন্ত্র। কিন্তু বাস্তব কি সত্যিই এত সরল?
এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, এটি শুধুমাত্র পুরুষদের প্রতিবাদ নয়। ইরানের নারীসমাজ, যারা বছরের পর বছর বাধ্যতামূলক হিজাব, পোশাক-নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে চাপা ক্ষোভ বহন করেছে, এবার রাস্তায় নেমেছে প্রকাশ্যেই। নারীদের অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে শুধু সংখ্যায় নয়, প্রতীকে এবং রাজনৈতিক অর্থেও এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। রাষ্ট্রের চোখে যা ‘নৈতিক শৃঙ্খলা’, নারীর কাছে তা বহুদিন ধরেই ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতার শৃঙ্খল।
গণবিক্ষোভের শুরু অর্থনৈতিক দাবিতে, এ কথা সত্য। লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, রিয়ালের পতন, নিষেধাজ্ঞার অভিঘাত, সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন প্রায় অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু খুব দ্রুত এই ক্ষোভ রূপ নেয় রাজনৈতিক প্রশ্নে। কেন একটি ধর্মীয়-রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় নাগরিকের কথা বলার অধিকার থাকবে না? কেন রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ? কেন ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একটি সীমিত ধর্মীয় এলিটের হাতে বন্দি?
এই প্রশ্নগুলোর কোনও উত্তর নেই সরকারের কাছে। ফলে দমনই হয়ে উঠেছে একমাত্র ভাষা। ইন্টারনেট বন্ধ, গণগ্রেপ্তার, প্রকাশ্য গুলি এবং শেষ পর্যন্ত ফাঁসির সাজা— সব মিলিয়ে রাষ্ট্র নিজেই তার নৈতিক বৈধতা ক্ষয় করছে। ২৬ বছরের এক যুবককে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করিয়ে সরকার কার্যত একটি বার্তাই দিচ্ছে, ভয়ের মাধ্যমে শাসনই একমাত্র পথ।
এই জায়গায় এসে ইরান সরকারের দায় এড়ানোর কৌশল নতুন নয়। বলা হচ্ছে, এই আন্দোলন বিদেশি মদতপুষ্ট। আমেরিকা ও ইজরায়েল অস্থিরতা তৈরি করছে। নিঃসন্দেহে পশ্চিমী শক্তিগুলি ইরানের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাজে লাগাতে চাইবে, এ রাজনীতির বাস্তবতা। কয়েক মাস আগে ইরানের পরমাণুকেন্দ্রগুলি লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল আমেরিকা ও ইজরায়েল।
কিন্তু প্রশ্ন হল, বিদেশি শক্তি কি এইভাবে মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করতে পারে, যদি ভিতরে ক্ষোভ না থাকে? বিদেশি ষড়যন্ত্র কি নারীদের নিজের জীবন বিপন্ন করে হিজাব খুলে প্রতিবাদে নামতে বাধ্য করতে পারে?
ইরানের শাসনব্যবস্থা প্রায় চার দশক ধরে একটি নির্দিষ্ট আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই আদর্শের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের বাস্তব জীবনের কোনও মিল নেই। বিশ্বায়িত তথ্যপ্রবাহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষা ও কাজের সুযোগ— সব মিলিয়ে ইরানের তরুণ সমাজ আর সেই বিপ্লব-উত্তর যুগে বাস করছে না। রাষ্ট্র সেই পরিবর্তন বুঝতে ব্যর্থ। ফলে আন্দোলন থামছে না। বরং প্রতিটি মৃত্যুই ক্ষোভকে গভীরতর করছে। নারীদের অংশগ্রহণ, শ্রমজীবী মানুষের যোগদান, শহর ও প্রান্তিক অঞ্চলের সংযোগ— সব মিলিয়ে এই আন্দোলন আর কোনও একক ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যকার বিশ্বাসভঙ্গের প্রকাশ।
ইরানের সামনে আজ দু’টি পথ। এক, আরও কঠোর দমন, আরও ফাঁসি, আরও ভয়। অন্যটি, আত্মসমালোচনা, সংস্কার এবং নাগরিকের সঙ্গে নতুন সামাজিক চুক্তি। ইতিহাস বলছে, প্রথম পথ সাময়িক নীরবতা আনতে পারে, স্থিতি নয়। দ্বিতীয় পথ কঠিন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায় এটিই।
এই গণবিক্ষোভ ইরানের বিরুদ্ধে নয়, ইরানের ভবিষ্যতের পক্ষে। রাষ্ট্র যদি তা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে দায় শুধু অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে ইতিহাসের আদালত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না।