বিনিয়োগের দরজা খুলুক বাংলায়

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির সামনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির একটি হলো—বড় শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগকে কীভাবে রাজ্যে ফিরিয়ে আনা যায়। কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো, উৎপাদন, পরিষেবা এবং রাজস্ব— সব ক্ষেত্রেই বৃহৎ বিনিয়োগের প্রভাব পড়ে। সেই দিক থেকে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্সের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মুম্বাই বৈঠককে গুরুত্ব দিয়ে দেখা স্বাভাবিক।
মুকেশ আম্বানির সঙ্গে বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিনিয়োগ এবং রাজ্যে রিলায়েন্সের ইতিমধ্যে থাকা ব্যবসা ও শিল্পের সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আলোচনার সুনির্দিষ্ট ফলাফল এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে এখনই কোনও নির্দিষ্ট প্রকল্প বা বিনিয়োগের অঙ্ক ধরে নেওয়ার কারণ নেই। কিন্তু বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে রাজ্যের বিনিয়োগ-সম্ভাবনা তুলে ধরা নিঃসন্দেহে শিল্পায়নের দরজা খোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা।
এখানে আরও একটি সম্ভাবনার কথা মনে রাখা যায়। অনন্ত আম্বানির উদ্যোগে গুজরাতের জামনগরে গড়ে ওঠা ‘বনতারা’ আজ বন্যপ্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের একটি বৃহৎ পরিসরের উদ্যোগ। রিলায়েন্সের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বিস্তার ৩,৫০০ একরেরও বেশি এবং সেখানে বিপুল সংখ্যক প্রাণী ও পাখির পরিচর্যা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও বনাঞ্চলের কথা বিবেচনা করলে ভবিষ্যতে এই ধরনের কোনও উদ্যোগ বাংলায় আসতে পারে— এমন প্রত্যাশা অমূলক নয়। তবে এ মুহূর্তে সেটিকে সম্ভাবনা হিসেবেই দেখা উচিত, ঘোষিত প্রকল্প হিসেবে নয়।
একই সঙ্গে গৌতম আদানির নেতৃত্বাধীন আদানি গোষ্ঠীর নিউ টাউনের হাসপাতাল প্রকল্পটিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্য সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে ২,০০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল গড়ে উঠবে এবং ১,০০০ শয্যা দরিদ্র ও আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। আদানি গোষ্ঠী প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।
এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু হাসপাতালের শয্যার সংখ্যায় নয়। উন্নত চিকিৎসা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে পৌঁছনো, আধুনিক চিকিৎসা-পরিকাঠামো তৈরি, চিকিৎসা-শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি— সব মিলিয়ে এর সম্ভাব্য প্রভাব অনেক বিস্তৃত। বিশেষ করে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য ১,০০০ শয্যার বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে তার সামাজিক গুরুত্বও যথেষ্ট হবে।
রিলায়েন্স ও আদানি— দুই বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগের মধ্যে তাই একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক বার্তা রয়েছে। বাংলার দরজা শিল্পের জন্য খোলা থাকতে হবে। যে বিনিয়োগই আসুক, তার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা, শ্রমিকের স্বার্থ, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন— এই বিষয়গুলিও সমান গুরুত্ব পাওয়া দরকার।
রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে শিল্প বিনিয়োগকে যদি রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখা যায়, তবে বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের নিয়মিত সংলাপ জরুরি। শুধু ঘোষণায় নয়, বিনিয়োগের বাস্তবায়নেই সাফল্যের মাপকাঠি।
মুম্বাইয়ে মুকেশ আম্বানির সঙ্গে বৈঠক সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টারই একটি অংশ। রিলায়েন্সের সম্ভাব্য নতুন উদ্যোগ, বাংলায় ‘বনতারা’-র মতো কোনও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং নিউ টাউনে আদানি গোষ্ঠীর হাসপাতাল— এই তিনটি ক্ষেত্রই যদি বাস্তব রূপ পায়, তবে শিল্প, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ লাভবান হতে পারে। এখন প্রয়োজন কথাকে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং কার্যকর প্রকল্পে
রূপ দেওয়া।