সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্ব, ইসি-র দ্বারস্থ দুই পক্ষ

Photo: প্রতীকী চিত্র(File photo)

তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দলীয় বিরোধের জেরে একদিকে যেমন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দ্বারস্থ হয়েছে দুই পক্ষ, অন্যদিকে দলের আর্থিক লেনদেন নিয়েও আদালতের হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই দুই প্রক্রিয়া— নির্বাচনী স্বীকৃতি ও আর্থিক স্বচ্ছতা— একসঙ্গে চলতে থাকায় গোটা বিষয়টি এখন বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে।

বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন মূল শিবির। বিদ্রোহী গোষ্ঠী দাবি করেছে, তারা বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পেয়েছে এবং সেই ভিত্তিতে দলের নাম, প্রতীক এবং তহবিলের উপর তাদের অধিকার থাকা উচিত। এই দাবির প্রেক্ষিতে তারা নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে।

অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির এই পদক্ষেপকে বেআইনি বলে দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করার অধিকার শুধুমাত্র অনুমোদিত প্রতিনিধিদেরই রয়েছে। পাশাপাশি তারা অভিযোগ করেছে, কেন্দ্রীয় স্তরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই বৈঠক আয়োজিত হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে এখনও কোনও সরকারি মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবু রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।


নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে উভয় পক্ষকেই লিখিতভাবে নিজেদের অবস্থান জানাতে বলেছে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রতিক্রিয়া না এলে বা মতবিরোধ বজায় থাকলে কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিতর্ক ঘোষণা’ করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে। এ ধরনের ক্ষেত্রে কমিশন সাধারণত সুপ্রিম কোর্টের নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ড অনুসরণ করে— দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, দলীয় সংবিধান এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন।

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর আগেও এমন বহু নজির রয়েছে। শিবসেনা এবং ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি)-র মতো দলগুলির ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দলীয় কাঠামো ও সংবিধানের গুরুত্বও সমানভাবে বিবেচিত হয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তৃণমূলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিশ্লেষণ প্রযোজ্য হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই দলের আর্থিক দিক নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে। একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে থাকা তৃণমূলের একাধিক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে দল আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। অভিযোগ, প্রায় ২৪৪০ কোটি টাকা ওই অ্যাকাউন্টগুলিতে জমা রয়েছে। বিদ্রোহী শিবিরের কয়েকজন বিধায়ক এই অর্থের উৎস ও লেনদেন নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়ে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

কলকাতা হাই কোর্ট এই বিষয়ে ব্যাঙ্ক, রাজ্য সরকার এবং দলের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছে। আদালত আপাতত অ্যাকাউন্টগুলি মুক্ত করার নির্দেশ দেয়নি, বরং সব পক্ষকে লিখিত বক্তব্য জমা দেওয়ার সময় দিয়েছে। এই পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, আদালত বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে চাইছে এবং সমস্ত তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী।

আইনজীবীদের বক্তব্যেও এই দ্বন্দ্বের জটিলতা প্রতিফলিত হয়েছে। একদিকে দাবি করা হয়েছে, শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা যুক্তিসঙ্গত নয়; অন্যদিকে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। ফলে প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পষ্ট যে, তৃণমূল কংগ্রেসের এই অন্তর্দ্বন্দ্ব কেবল একটি রাজনৈতিক বিরোধ নয়, বরং এটি সাংবিধানিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষা। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, আদালতের হস্তক্ষেপ এবং দলীয় গণতন্ত্র— এই তিনটি দিকই এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিরোধ কোন দিকে গড়ায়, তা নির্ভর করবে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার উপর। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এবং আদালতের রায়— উভয়ই ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করবে। আপাতত পরিস্থিতি একটি অপেক্ষার পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে।