সুদীপ ঘোষ
আধুনিক রাষ্ট্রে সমাজ এবং ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক পরিচালিত হয় সাংবিধানিক নীতিমালার দ্বারা। ভারতের সাংবিধানিক পরিসরে ব্যক্তিগত আইন, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং লিঙ্গসমতার প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই এক জটিল ও সংবেদনশীল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে দায়ের হওয়া একটি লেখ আবেদন এই বিতর্ককে একটি নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে। এই আবেদনে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের কিছু নির্দিষ্ট বিধানকে নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক বলে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এই মামলাটি কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় আইনের আইনি পর্যালোচনা নয়; বরং এটি রাষ্ট্র ও সমাজের বৃহত্তর দ্বন্দ্বের একটি রূপ। এই বিতর্কের মূলে রয়েছে ব্যক্তির অধিকার এবং সম্প্রদায়ের নিজস্ব নিয়মের মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্ব। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীন সত্তা, আত্মমর্যাদা এবং সমঅধিকার সুরক্ষিত হওয়া উচিত। ভারতীয় সংবিধানের সমতার অধিকার, বৈষম্যহীনতা এবং জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলি এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই রচিত। আবেদনকারীদের মূল যুক্তিটিও একই। তাঁরা দাবি করেছেন যে, ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীনে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধানগুলো নারীদের সমান অধিকার প্রদান করে না। পুরুষের তুলনায় নারীর সম্পত্তির অংশ অর্ধেক বা ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়েও কম নির্ধারণ করা এবং সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপ করা— এই বিষয়গুলো সংবিধান-স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
অন্যদিকে, একটি রাষ্ট্র কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির সমষ্টি নয়, বরং এটি বিভিন্ন সম্প্রদায় ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন। ভারতীয় সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারকেও স্বীকৃতি দেয়। ফলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে— একজন নারী কি রাষ্ট্রের চোখে প্রথমে একজন সমানাধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক, নাকি তিনি প্রথমে তাঁর ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একজন সদস্য? যখন কোনও ধর্মীয় প্রথা বা ব্যক্তিগত আইন মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়, তখন রাষ্ট্র কোনটিকে অগ্রাধিকার দেবে—নাগরিকের ব্যক্তিগত সমতা, নাকি সম্প্রদায়ের নিজস্ব পরিসর? এই প্রশ্নের কোনও সরল উত্তর নেই।
এই দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ আদালতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালত একদিকে সংবিধানের রক্ষক হিসেবে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে, অন্যদিকে আইনসভা বা সমাজের নিজস্ব পরিসরে হস্তক্ষেপ না করার নীতিও তাকে মেনে চলতে হয়। শুনানির সময় বিচারপতিরা এই দ্বৈত দায়িত্ব ও সংকটের দিকটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁরা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন তুলেছেন— ব্যক্তিগত আইনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ কতটা যুক্তিসঙ্গত? একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই ধরনের মৌলিক সামাজিক ও ধর্মীয় আইনের পরিবর্তন কি আদালতের আদেশের মাধ্যমে হওয়া উচিত, নাকি তা জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা আইনসভা থেকে বা সমাজের অভ্যন্তর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসা উচিত? সামাজিক সংস্কার অনেক ক্ষেত্রে সমাজের অভ্যন্তর থেকেই আসা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সমাজ যখন তার কোনও একটি অংশের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে, বিশেষত যখন মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠেছে, তখন আদালত নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না।
উত্তরাধিকার আইনের এই বৈষম্যকে কেবল ধর্মীয় অধিকারের গণ্ডিতে দেখলে এর একটি বড় অংশ অধরা থেকে যায়। দীর্ঘকাল ধরে রাষ্ট্র ব্যক্তিগত আইন বা ধর্মীয় প্রথার অজুহাতে পরিবারের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থেকেছে। এর ফলে পরিবারের ভেতরে সম্পত্তির অধিকার বা উত্তরাধিকারের মতো বিষয়গুলোতে নারী অবহেলিত থেকেছেন। পুরুষের তুলনায় নারীকে সম্পত্তিতে কম অধিকার দেওয়া মূলত নারীকে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল করে রাখার একটি কাঠামোগত প্রবণতা। সংবিধানের সমতা, বৈষম্যবিরোধী নীতি এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার এই ধরনের আইনি বৈষম্যের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই আলোচনার একটি অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রসঙ্গ উঠে আসে। ভারতীয় সংবিধানে সমগ্র ভারতের নাগরিকদের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো— নাগরিকদের জন্য সমান্তরাল আইনি কাঠামো নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তিগত আইনের মোড়কে লুকিয়ে থাকা বৈষম্য দূর করা। তবে, এর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জটিলতা রয়েছে। বিরোধীরা আশঙ্কা করেন যে, অভিন্ন আইনি কাঠামো চাপিয়ে দিলে তা ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
বর্তমান মামলায় আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত হয়েছে, তা হলো ভৌগোলিক ও আইনি বৈষম্যের প্রশ্ন। সম্প্রতি উত্তরাখণ্ড রাজ্যে প্রণীত অভিন্ন দেওয়ানি বিধির ফলে সেখানে বসবাসরত মুসলিম নারীরা আইনিভাবে পুরুষদের সমান উত্তরাধিকার অধিকার পাচ্ছেন। অথচ, দেশের অন্যান্য অংশে বসবাসরত মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে পুরনো ব্যক্তিগত আইনই প্রযোজ্য হচ্ছে। এর ফলে একই রাষ্ট্রের নাগরিক এবং একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কেবলমাত্র ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আইনি অধিকারের ক্ষেত্রে ব্যাপক পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। দেশের সংবিধানে যে আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকার দেওয়া হয়েছে, এই পরিস্থিতি তার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ— তা এখন এক বড় বিচারাধীন প্রশ্ন। এই জটিল প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত সরাসরি কোনো রায় না দিয়ে, কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাব চেয়েছে এবং এই আইনের দ্বারা বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সামনে আনার নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের এই পদক্ষেপকে একটি অত্যন্ত সতর্ক এবং পরিমিত কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে। আদালত অনুধাবন করতে পেরেছে যে, বিমূর্ত তাত্ত্বিক বিতর্কের ভিত্তিতে এত বড় একটি আইনের পরিবর্তন করা উচিত নয়। বরং, যারা বাস্তবে এই বৈষম্যের শিকার, তাদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই সাংবিধানিক অধিকারের পর্যালোচনা হওয়া উচিত।
পরিশেষে বলা যায়, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত এই মামলাটি ভারতের সাংবিধানিক গণতন্ত্রের এক কঠিন পরীক্ষার ক্ষেত্র। এর মাধ্যমে নির্ধারিত হবে— কীভাবে একটি বিশাল, বৈচিত্র্যময় এবং বহুত্ববাদী সমাজে লিঙ্গসমতা, ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং সম্প্রদায়ের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। গণতন্ত্রে অধিকারের এই দ্বন্দ্বের কোনও জাদুকরী সমাধান নেই। তবে বিচারবিভাগীয় প্রজ্ঞা এবং সামাজিক সংবেদনশীলতার মাধ্যমে এই জটিল প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করার যে প্রচেষ্টা চলছে, তা একটি সজীব সমাজেরই পরিচয়
বহন করে।