ভারতীয় অর্থনীতির সামনে মূল্যবৃদ্ধির চাপ

Image: IANS

ভারতীয় অর্থনীতির সামনে নতুন করে কিছুটা উদ্বেগের কারণ তৈরি হয়েছে। আপাতত খুচরো ও পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির হার খুব ভয়াবহ বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন বুঝিয়ে দিচ্ছে, আগামী কয়েক মাসে মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ধরে চড়া থাকে, তার প্রভাব ভারতের মতো তেল-নির্ভর অর্থনীতিতে সরাসরি পড়বে।

ভারতের অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। পরিবহণ থেকে কৃষি, শিল্প থেকে দৈনন্দিন পণ্য—প্রায় সব ক্ষেত্রেই তেলের দামের প্রভাব রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে শুধু পেট্রল বা ডিজেলের দাম বাড়ার আশঙ্কাই থাকে না, পরিবহণ ও উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তার চাপ এসে পড়ে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের উপর।

বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা। লোহিত সাগর ও তার আশপাশের অঞ্চলে সংঘাত এবং জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহের উপর চাপ তৈরি করেছে। সৌদি আরব-সহ বড় তেল উৎপাদক দেশগুলির সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ে। এই পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে তেলের বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।


এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সুদের হারের অনিশ্চয়তা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার বাড়লে বিশ্বজুড়ে অর্থের খরচ বেড়ে যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলির উপরও তার প্রভাব পড়ে। বিশেষত যখন একই সময়ে তেলের দাম বাড়ছে, তখন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।

ভারতের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও সরকার যদি তার সম্পূর্ণ বোঝা সাধারণ ভোক্তার উপর না চাপায়, তাহলে পেট্রল-ডিজেলের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রিত রাখা সম্ভব। এতে মূল্যবৃদ্ধির তাৎক্ষণিক চাপ কম থাকে। কিন্তু দীর্ঘদিন এভাবে চললে সরকারের উপর ভর্তুকি বা রাজস্ব ক্ষতির চাপ বাড়ে। অর্থাৎ আজকের মূল্যবৃদ্ধি সামলাতে গিয়ে ভবিষ্যতের সরকারি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

এখানেই সরকারের সামনে সবচেয়ে কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্নটি আসে। একদিকে জ্বালানির দাম হঠাৎ বাড়িয়ে দিলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সংসারে অতিরিক্ত চাপ পড়বে। অন্যদিকে দাম দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে ধরে রাখলে সরকারি কোষাগারের উপর বোঝা বাড়বে। সেই অর্থ অন্য উন্নয়নমূলক খাতে ব্যয় করা সম্ভব হবে না। তাই শুধু জ্বালানির দাম স্থির রাখাই সমাধান নয়; রাজস্ব পরিস্থিতি, মূল্যবৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা—তিনটিকেই একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

অন্যদিকে, জ্বালানির দাম বাড়লে খুচরো মূল্যবৃদ্ধিও বাড়তে পারে। তখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে কঠিন সিদ্ধান্তের পরিস্থিতি তৈরি হবে। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সুদের হার বাড়লে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে, বিনিয়োগ ও ভোগব্যয় কমতে পারে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়বে।

এই চাপের সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারেন সীমিত আয়ের মানুষ। জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব যখন খাদ্য, পরিবহণ ও পরিষেবার খরচে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আয়ের তুলনায় সংসারের ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকে। ফলে শুধু সরকারি মূল্যসূচকে মুদ্রাস্ফীতির হার কত, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সেই মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত কতটা পড়ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে, তেলের সরবরাহও স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু ঝুঁকিগুলিকে উপেক্ষা করারও অবকাশ নেই। বিশেষ করে ভারতের মতো যে দেশ তার প্রয়োজনের বড় অংশের অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার পক্ষে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের অস্থিরতা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের প্রধান কাজ হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে জ্বালানির মূল্য, রাজস্ব এবং মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য তৈরি করা। একই সঙ্গে রিজার্ভ ব্যাঙ্ককেও সুদের হার নির্ধারণের সময় শুধু বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি নয়, আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এবং বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখতে হবে।

সামনের কয়েক মাস তাই ভারতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তেলের দাম, বিশ্ববাজারের সুদের হার এবং দেশের মূল্যবৃদ্ধি—এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের সংসার খরচ থেকে শুরু করে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়বে। তাই এখন থেকেই সতর্ক থাকা এবং সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়াই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়।