কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়
একটি রাজ্যের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড এবং আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে তার শিল্পায়নের ওপর ভিত্তি করে। পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি রাজ্য, যার ইতিহাস গৌরবোজ্জ্বল শিল্প সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহন করে। একসময় যে রাজ্যকে ভারতের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ বা উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র বলা হতো, যেখানে চটকল, সুতাকল, আর ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের চাকা দিনরাত ঘুরত, আজ সেই রাজ্যেই বন্ধ কারখানাগুলির সাইরেন স্তব্ধ হয়ে গেছে।
দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে একধরনের প্রশাসনিক স্থবিরতা, নীতিগত বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক উগ্রতার জাঁতাকলে পড়ে রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রটি কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছে। বর্তমানে যখন এক নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের আবহে দীর্ঘ ৫০ বছরের অরাজকতা কাটিয়ে উঠে নতুন করে সোনার বাংলা গড়ার ডাক দেওয়া হচ্ছে, তখন সবচেয়ে বড় এবং প্রথম চ্যালেঞ্জটি হলো— স্থবির হয়ে যাওয়া চাকাটিকে আবার সচল করা।
যা রাজ্যকে এই শিল্পহীনতার অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সেই অচলাবস্থা ভাঙার প্রথম পদক্ষেপগুলো যা হওয়া উচিত, তা হল আজকের ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন ইমারত গড়ে তোলার কাজগুলি শুরু করা। তা করতে হলে আগে জানতে হবে এর ভিতটি কোথায় কীভাবে দুর্বল হয়েছিল।
গত পাঁচ দশকে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রের পতনের পেছনে যে প্রধান কারণগুলি কাজ করেছে তা হল ষাট এবং সত্তরের দশক থেকে রাজ্যে যে উগ্র ট্রেড ইউনিয়ন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছিল, তা শিল্পের স্বাস্থ্যরক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে বেশি ব্যস্ত ছিল। ‘ঘেরাও’ বা ‘লক-আউট’ হয়ে উঠেছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ফলস্বরূপ, টাটা, বিড়লা বা গোয়েঙ্কার মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো, যারা এই রাজ্যকে কেন্দ্র করে ব্যবসা বাড়াচ্ছিল, তারা বাধ্য হয়ে নিজেদের পুঁজি অন্য রাজ্যে সরিয়ে নিয়ে যায়।
স্বাধীনতার পর কেন্দ্রের ‘ফ্রেট ইকুয়ালাইজেশন পলিসি’ বা পণ্যমাশুল সমীকরণ নীতির কারণে খনিজ সমৃদ্ধ রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ তার ভৌগোলিক সুবিধা হারিয়েছিল। পরবর্তীকালে রাজ্যের তৎকালীন শাসকেরা সেই সংকটের মোকাবিলা বিকল্প উপায়ে না করে, কেবল কেন্দ্রের দিকে আঙুল তুলে নিজেদের দায় এড়িয়ে গিয়েছে।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন তথ্যপ্রযুক্তি এবং গাড়ি কারখানার হাত ধরে রাজ্য আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখন সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রামের ল্যান্ড-অ্যাকুইজিশন বা জমি অধিগ্রহণ বিতর্ক রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয়। ‘জোর করে জমি নেওয়া চলবে না’ বনাম ‘শিল্পের জন্য জমি চাই’— এই দ্বন্দ্বে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে গিয়ে রাজ্য এমন এক ‘শিল্পবিরোধী’ তকমা গায়ে মেখে নিল, যা গত দেড় দশকেও সম্পূর্ণ মুছে ফেলা যায়নি।
এই সময়ের মধ্যে বেশ কয়েক হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেল। মানুষ সামান্য রোজগারের জন্য অন্যপ্রদেশে কাজ খুঁজতে চলে গেল। হুগলির দুই পাড়ে চটকলগুলোর দিকে বা আসানসোল-দুর্গাপুরের বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি কারখানাগুলোর দিকে তাকালে কেবল এক শূন্যতা চোখে পড়ে। হাজার হাজার একর জমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, যার মালিকানা আইনি জটিলতায় বন্দি। শ্রমিক কোয়ার্টারগুলো আজ ভূতুড়ে আবাসন। যে শ্রমিকেরা একসময় রাজ্যের অর্থনীতি সচল রাখতেন, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম আজ পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিন রাজ্যে— গুজরাত, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ বা কর্ণাটকে রাজমিস্ত্রি, সিকিউরিটি গার্ড, সোনার দোকানের কারিগর বা দর্জির কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এটা ঘটনা যে দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে তৈরি হওয়া এই গভীর ক্ষতকে রাতারাতি সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন এক সুনির্দিষ্ট, কঠোর এবং দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা, যা কোনও সস্তা রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং নিখাদ অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হলেই তা আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যকে শিল্পে সচল করে তুলবে।
নতুন সরকার বা নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগকারীদের মনে ‘বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনা। টাকা বা পুঁজি অত্যন্ত লাজুক জিনিস; যেখানে নিরাপত্তা নেই, সেখানে পুঁজি আসে না। তাই প্রথম পর্বের রণকৌশল হিসেবে মূল বিষয়গুলিকে ভিত্তি করে অবিলম্বে কাজ শুরু করা বোধহয় সঠিক কাজ হবে।
অতীতে দেখা গিয়েছে, একটি কারখানা তৈরি করতে গেলে পরিবেশ দপ্তর, ভূমি দপ্তর, বিদ্যুৎ পর্ষদ-সহ প্রায় ডজনখানেক টেবিল ঘুরে অনুমতি নিতে হতো। এতে বছরের পর বছর সময় নষ্ট হতো এবং দুর্নীতি বাড়ত।
বর্তমানে প্রযুক্তির যুগে সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং সময়াবদ্ধ (Time-bound) ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ ব্যবস্থা চালু করা গেলে কাজ করাটা সহজ হবে। একজন শিল্পপতি রাজ্যে বিনিয়োগ করতে চাইলে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে যদি সমস্ত আইনি ছাড়পত্র পেয়ে যান, তা হলে নিশ্চিত হয়ে কাজ শুরু করতে পারবে।
নতুন করে কৃষিজমি অথবা অন্য কোনও জমি অধিগ্রহণ করতে গেলে আবার রাজনৈতিক অশান্তি তৈরি হতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কাজেই রাজ্যে যে হাজার হাজার একর বন্ধ কারখানার জমি পড়ে রয়েছে, সেগুলোকে চিহ্নিত করে একটি সরকারি ‘ল্যান্ড ব্যাঙ্ক’ পোর্টাল তৈরি করা খুব দরকার। এই জমিগুলির আইনি ও আর্থিক জট (যেমন ব্যাঙ্কের ঋণ বা বকেয়া কর ইত্যাদি) সরকার নিজে মধ্যস্থতা করে মিটিয়ে নেবে। বিনিয়োগকারীদের তাহলে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে তাদের চাষের জমি ছুঁতে হবে না, তৈরি পরিকাঠামো ও জমি নিয়ে কারখানা শুরু করা মনে হয় তখন অসম্ভব হবে না।
পশ্চিমবঙ্গের শিল্পের অন্যতম বড় শত্রু হলো স্থানীয় স্তরের ‘সিন্ডিকেট রাজ’ এবং রাজনৈতিক দাদাগিরি। কারখানায় কোন মাল সাপ্লাই হবে, কারা লেবার হিসেবে ঢুকবে— তা যদি পাড়ার রাজনৈতিক নেতারা ঠিক করে, তবে কোনও বড় ব্র্যান্ড যেমন এখানে টিকবে না তেমন তারা আসতেও চাইবে না।
প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিশেষ ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ টাস্ক ফোর্স’ গঠন করতে হবে। কোনও ব্যবসায়ী বা শিল্পপতির কাছে রাজনৈতিক চাঁদা বা তোলা চাওয়া হলে, তা যেন সরাসরি জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। আইন-শৃঙ্খলার এই কড়া বার্তাটিই হবে বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সবুজ সংকেত।
ভারী শিল্পের পাশাপাশি বাংলার নিজস্ব কিছু ঐতিহ্যবাহী শিল্প রয়েছে, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের রুটি-রুজির ব্যবস্থা অনায়াসে করতে পারে। চটকল (Jute Mills) এবং সুতাকলগুলি (Textile) এর মধ্যে প্রধান। যা এইসময়ে বিলুপ্তপ্রায়।
প্লাস্টিক বর্জনের এই যুগে পাটের চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। কেবল চটের বস্তা তৈরি না করে, পাট থেকে আধুনিক ব্যাগ, জুতো, ঘরের সাজসজ্জার জিনিস এবং পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং তৈরির প্রযুক্তি আনা যেতে পারে। বন্ধ চটকলগুলিকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে তা শিল্পে অন্য মাত্রা যোগ করবে।
এই সমস্ত করতে গেলে সুস্থ মানসিকতা ও চিন্তা ভাবনা করা দরকার। ৫০ বছরের অরাজকতা কোনও সাধারণ রোগ নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি। এর নিরাময় করতে হলে প্রথমেই কোনও চটকদার বা ম্যাজিক সমাধানের আশা না করে, রাজ্যকে একটি ‘ব্যবসা-বান্ধব’ (Business-friendly) রাজ্য হিসেবে ভারতের মানচিত্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শ্রমিকদের বোঝাতে হবে যে, কারখানার মালিক তাদের শত্রু নয়, অংশীদার। আবার পুঁজিদারদের আশ্বস্ত করতে হবে যে, তাঁদের বিনিয়োগ এই মাটিতে সুরক্ষিত থাকবে।
যখন এই প্রাথমিক আস্থার পরিবেশ এবং পরিকাঠামোর জট খোলার কাজ শেষ হবে, তখনই শুরু হবে আসল লড়াই— যেখানে আসবে বড় পুঁজি, তৈরি হবে নতুন প্রযুক্তির শিল্প,আইটি হাব ও নানাবিধ শিল্পের প্রস্তুতি। ৫০ বছর খুব কম সময় নয়। বিগত দিনগুলির থেকে শিক্ষা নিতে হবে কেন আজ পশ্চিমবঙ্গের শিল্পের ভগ্ন অবস্থা! তা অনুধাবন করবেন বিশেষজ্ঞরা। সেইমতো কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সদর্থক মনোভাবই পারবে আবার শিল্পে পশ্চিমবঙ্গের হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরিয়ে আনতে।