ভারতের বিক্ষুব্ধ শরৎঋতু: অসন্তোষ ও কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান

Photo: ANI

সংসদ ভবন কিংবা সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করে এগিয়ে চলেছেন ভারতের তরুণ-তরুণীরা। তাঁদের সেই ছবি ও ভিডিও ছেয়ে গিয়েছে দেশের সমাজ-মাধ্যমের বড় অংশজুড়ে।

প্রথমে বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। এখন সেই ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ভোটার তালিকার সংশোধন। প্রতিবাদের তাৎক্ষণিক কারণগুলি আলাদা হলেও এর পিছনে থাকা হতাশার সঙ্গে সম্ভবত সেই কারণগুলির খুব বেশি সম্পর্ক নেই।

ভারতের ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষের আসল কারণ সম্ভবত একটি সম্মানজনক চাকরি খুঁজে পাওয়ার লড়াই। যে অর্থনীতি বিপুল সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি দেয়, কর্মসংস্থানের বাজারে প্রবেশ করতে চাওয়া তরুণদের কাছে তা বাস্তবে অনেক কম সুযোগ এনে দিচ্ছে বলে মনে
করা হচ্ছে।


দিল্লির স্বনামধন্য কাউন্সিল ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ধর বলেন, ‘কোভিডের পর থেকে সারা বিশ্বে কর্পোরেট সংস্থাগুলি কর্মীর সংখ্যা কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এর ফলে তরুণদের মধ্যে অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ বেড়েছে। ভারতের রাস্তায় কিংবা বিশ্বের অন্যত্র যে বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, তা এই পরিস্থিতিরই ইঙ্গিত দেয়।’

ভারত অবশ্য এর আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ষাট ও সত্তরের দশকে বেকারত্ব, ভাষাগত উত্তেজনা এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। পরে ১৯৯০ সালে শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ নিয়ে ক্ষোভের জেরে দেশ অচল হয়ে পড়েছিল। রাস্তায় নেমে এসেছিলেন বহু তরুণ-তরুণী। বিভিন্ন দাবির আড়ালে মূল কারণটি ছিল একই— কর্মসংস্থানের বাজারে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তবে তাঁদের জন্য থাকা সুযোগের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান।

অধ্যাপক ধর বলেন, ‘পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব দ্রুত বাড়ছে।’ তিনি এর আগে
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইকোনমিক স্টাডিজ অ্যান্ড প্ল্যানিংয়ে (সিইএসপি) শিক্ষকতা করেছেন।

২০২৬ সালে ভারতের তরুণ-তরুণীরা আগের যে কোনও সময়ের তুলনায় বেশি শিক্ষিত, বেশি সংযুক্ত এবং আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তা সত্ত্বেও শিক্ষাগত যোগ্যতা ক্রমশ আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আগের প্রজন্ম তুলনামূলকভাবে সহজে যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পেয়েছিল, বর্তমান প্রজন্মের কাছে তা ক্রমেই অধরা হয়ে উঠছে।

ভারতের অর্থনীতি বছরে প্রায় ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে বলে সরকারি দাবি। কিন্তু অর্থনীতির এই শক্তিশালী বৃদ্ধির ছবির সঙ্গে এমন এক শ্রমবাজারের বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন, যে বাজার তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হিমশিম খাচ্ছে। পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভের (পিএলএফএস) তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি যে তরুণ-তরুণীরা সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজছিলেন, তাঁদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬.২ শতাংশে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এই হার ছিল ১৩.৮ শতাংশ, যা তখনই উদ্বেগজনক বলে মনে করা হয়েছিল।

যেসব শহরে অধিকাংশ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে, সেই শহরাঞ্চলে তরুণদের বেকারত্বের হার আরও বেশি— ১৮.২ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে এই হার ১৫.১ শতাংশ। তরুণীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বর্তমান ছাত্র ও যুব আন্দোলনে যাঁদের অনেককে নেতৃত্বের ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে, সেই তরুণীদের মধ্যে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ২০.৭ শতাংশে। ভারতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৩৬ কোটি ৭০ লক্ষ। প্রতি বছর আরও লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী কর্মসংস্থানের বাজারে প্রবেশ করছেন। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সি স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার। একইভাবে, ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশও বেকার।

একসময় যে ডিগ্রিকে মধ্যবিত্ত জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা অর্জনের নির্ভরযোগ্য পথ বলে মনে করা হত, তার মূল্য ক্রমশ কমছে। কারখানার উৎপাদন ক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহার চাকরির সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই পরিষেবা ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরের চাকরিগুলিকে সংকুচিত করছে।

মেধাবী ও প্রতিভাবান তরুণদের বিদেশে যাওয়ার পথও এখন বাধার মুখে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলি অভিবাসনের নিয়ম আরও কঠোর করছে এবং বিদেশিদের জন্য উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ ক্রমশ বন্ধ করে দিচ্ছে।

বর্তমান প্রজন্মের আর একটি বড় সমস্যা হল শ্রেণিকক্ষে যা শেখানো হয়, তার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার বিস্তর ফারাক। নিয়োগকর্তাদের অভিযোগ, চাকরিপ্রার্থীদের যথেষ্ট ব্যবহারিক দক্ষতা নেই। অন্যদিকে, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শেখা এবং কর্মক্ষেত্রে কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত।

সরকারি নীতি-নির্ধারণী সংস্থা নীতি আয়োগের একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের মাত্র ৮ শতাংশ স্কুলে জাতীয় দক্ষতা যোগ্যতা কাঠামোর (ন্যাশনাল স্কিলস কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠ্যক্রম রয়েছে।

তবে শুধু দক্ষতা বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। ভারতের অর্থনীতি যে কর্মসংস্থানহীন বৃদ্ধির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, তার মোকাবিলা করাও জরুরি। আরও বেশি কর্মোপযোগী স্নাতক তৈরি করলেও বিশেষ লাভ হবে না, যদি তাঁদের নিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত চাকরি অর্থনীতিতে সৃষ্টি না হয়।

ভারতের প্রয়োজন এমন একটি কর্মীবাহিনী, যাঁরা আধুনিক শিল্পের চাহিদা পূরণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে প্রয়োজন এমন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, যাদের এই কর্মীদের নিয়োগ করার ইচ্ছা ও সামর্থ্য রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি উপায় হল শিল্পক্ষেত্রে সরকার যে প্রণোদনা দেয়, তার নীতিতে পরিবর্তন আনা। অধ্যাপক ধর বলেন, ‘সরকারকে শিল্পক্ষেত্রে দেওয়া প্রণোদনার নীতি নতুন করে সাজাতে হবে এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার শর্তগুলির মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’

অন্য একাংশের মতে, শ্রমনির্ভর শিল্পের বিকাশে আরও বেশি প্রণোদনা দেওয়া উচিত। আবার কেউ কেউ মনে করেন, একটি নির্দিষ্ট সীমার পর রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। অন্যদের মতে, পরিষেবা ক্ষেত্রের বিকাশই কর্মসংস্থানের নতুন পথ খুলে দিতে পারে।

তবে প্রতিটি প্রতিবাদকে শুধু কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু বেকারত্ব ও অর্ধবেকারত্বের সমস্যা বিভিন্ন ধরনের অসন্তোষকে একত্রিত করে বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বৃহত্তর ক্ষোভে পরিণত করতে পারে।

সমাজমাধ্যম এই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করে তুলছে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বৈষম্য এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা— দুটিই উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে উঠছে।

তাই সরকারের সামনে বিপদ শুধু একের পর এক পথবিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশা পূরণ না হলে শিক্ষা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিশ্রুতির ওপর মানুষের আস্থাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।