ভারতের ভূমিকা

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

পশ্চিম এশিয়ায় যখন যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে উঠেছে, তখন কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রতিটি ইঙ্গিতই হয়ে ওঠে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এমন এক সময়েই ২০২৬ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ইজরায়েল সফরে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সফরটি ঘিরে দেশীয় রাজনীতিতে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। কংগ্রেস ও সিপি আই (এম) পৃথক বিবৃতিতে এই সফরের সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্য, যখন পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল, তখন এমন সফর ভারতের ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে ভুল বার্তা দিতে পারে।

কংগ্রেসের বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহাসিক ভিত্তির কথা স্মরণ করানো হয়েছে। ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’— পৃথিবী এক পরিবার— এই দর্শন শুধু একটি স্লোগান নয়, বহু দশক ধরে ভারতের আন্তর্জাতিক আচরণের নৈতিক কাঠামো। সেই সঙ্গে রয়েছে মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার আদর্শ এবং জওহরলাল নেহরুর নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি। ভারতীয় সংবিধানের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে নির্দেশ দিয়েছে। এই নীতিগত ভিত্তিই স্বাধীনতার পর ভারতকে দিয়েছিল এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর।

কংগ্রেস আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারতের ভূমিকা বরাবরই গঠনমূলক ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে ভারত প্রথম সারিতে দাঁড়িয়েছিল। কোরিয়ার যুদ্ধে নিরপেক্ষ দেশগুলির পুনর্বাসন কমিশনে ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক আস্থার প্রমাণ। এশিয়া ও আফ্রিকার উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে সমর্থন, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দীর্ঘ অবদান— সব মিলিয়ে ভারত নিজেকে এক নীতিনিষ্ঠ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় কংগ্রেসের বক্তব্য, পশ্চিম এশিয়ায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পক্ষেই ভারতের থাকা উচিত।


সমস্যার মূল প্রশ্নটি অবশ্য সফরের ‘সময়কাল’। বর্তমানে ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি জড়িত। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সফর আন্তর্জাতিক মহলে এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে, ভারত সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে। কংগ্রেসের ভাষায়, এটি সামরিক উত্তেজনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমর্থনের ধারণা তৈরি করতে পারে। পররাষ্ট্রনীতিতে ধারণা বা perception-ও বাস্তবতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল ঘোষণার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, প্রতীকী পদক্ষেপও তার বার্তা বহন করে। অবশ্যই ভারতের সঙ্গে ইজরায়েলের কৌশলগত সম্পর্ক নতুন নয়। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কৃষি ও সাইবার নিরাপত্তায় দুই দেশের সহযোগিতা গত এক দশকে আরও গভীর হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত ঐতিহাসিকভাবে প্যালেস্তাইনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই দুই সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্যই ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয়। প্রশ্ন হলো, বর্তমান উত্তেজনার আবহে সেই ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা সম্ভব?

পররাষ্ট্রনীতি কখনও স্থির নয়, তা সময় ও স্বার্থের সঙ্গে বদলায়। কিন্তু একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তার ঘোষিত নীতির ধারাবাহিকতার উপর। যদি ভারত আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রসঙ্ঘ সনদ, জেনেভা কনভেনশন বা মানবাধিকার চুক্তির প্রতি অঙ্গীকারের কথা বলে, তবে সংঘাতের মুহূর্তে সেই অঙ্গীকারের প্রতিফলনও প্রত্যাশিত।

এই বিতর্কে সরকারের যুক্তিও নিশ্চয়ই আছে— কূটনৈতিক সংলাপ চালু রাখা, প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বজায় রাখা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পক্ষে বার্তা দেওয়া। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি। নীরবতা বা অস্পষ্টতা বিভ্রান্তি বাড়ায়। ভারতের মতো উদীয়মান শক্তির কাছে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা বেশি; তাই তার পদক্ষেপও আরও বিচক্ষণ হওয়া উচিত। সবশেষে, প্রশ্নটি দলীয় রাজনীতির নয়; এটি ভারতের বৈদেশিক পরিচয়ের প্রশ্ন।

আমরা কি কেবল কৌশলগত স্বার্থের নিরিখে অবস্থান নেব, নাকি নীতিগত ঐতিহ্যের আলোয় পথ খুঁজব? পশ্চিম এশিয়ার অস্থির সময়ে ভারতের কণ্ঠ যদি শান্তি, সংলাপ ও সংযমের পক্ষে উচ্চারিত হয়, তবেই তা আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। যুদ্ধের আবহে প্রতিটি সফর, প্রতিটি করমর্দন এবং প্রতিটি যৌথ বিবৃতি বহন করে গভীর বার্তা। সেই বার্তা যেন শান্তির পক্ষে যায়, এই প্রত্যাশাই আজ প্রধান।