জনসংখ্যার বৈচিত্র ও তরুণ সমাজের প্রাচুর্য নিয়ে ভারত দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে গর্ববোধ করে এসেছে। ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শিখরে পৌঁছানোই ছিল আমাদের মূল জাতীয় লক্ষ্য। কিন্তু এই তরুণ ভারতের আড়ালেই নীরবে ঘটে চলেছে এক বিশাল জনসংখ্যাগত রূপান্তর–দেশের প্রবীণ নাগরিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি। স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম(SRS) ও রাষ্ট্রসঙ্ঘের জনসংখ্যার রিপোর্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়; ভারতে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই হবেন প্রবীণ নাগরিক; যা সংখ্যার বিচারে প্রায় ৩৪ কোটির কাছাকাছি। সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পৃষ্ঠার জন্য এটি কেবল কোনো সামাজিক বা স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনার বিষয় নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ও ‘সিলভার ইকোনমি’(Silver Economy )-র প্রস্তুতির এক অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যালোচনা।
ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সমাজব্যবস্থা যৌথ পরিবার ও পারিবারিক সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে প্রবীনদের সুরক্ষা প্রদান করে এসেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক দ্রুত পরিবর্তন; নগরায়ন; উন্নত জীবিকার সন্ধানে তরুণ প্রজন্মের স্থানান্তর এবং একক পরিবারের সঙ্গতির কারণে প্রবীণরা আজ সামাজিকভাবে একাকীত্ব ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। যে দেশে সামাজিক সুরক্ষামূলক পেনশন ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বৃহৎ অংশ কোনো প্রথাগত রিটায়ারমেন্ট বা পেনশন সুবিধার আওতায় পড়ে না; সেখানে বার্ধক্য কেবল এক স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া নয়; তা এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।
তবে মুদ্রার অপর পিঠটি কেবল সংকটের নয়; তা সম্ভবনারও। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয়তা; সেবা; স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বিশ্বজুড়ে ‘সিলভার ইকোনমি’ বলা হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো অনেক আগেই প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও সঞ্চয়কে জাতীয় মূলধনে রূপান্তরিত করেছে। ভারতের মতো দেশেও প্রবীণ নাগরিকরা কেবল রাষ্ট্রের জন্য ‘দায়’ বা ‘বোঝা’নন; বরং তারা নতুন এক বিশাল ভোক্তা শ্রেণী ও অভিজ্ঞ জনশক্তির উৎস হতে পারেন— এই দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ঘটানো এখন সময়ের দাবি।
সিলভার ইকোনমির প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হল স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং ‘জেরিয়াট্রিক কেয়ার’ (Geriatric Care)-এর প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার। প্রবীণ বয়সে ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি; যেমন আলঝেইমার্স; ডিমেনশিয়া; হৃদরোগ বা পক্ষঘাতের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ভারতের বিদ্যমান প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পরিকাঠামো এখনো প্রবীণ- বান্ধব হয়ে ওঠেনি। সরকারি আয়ুষ্মান ভারত বা বেসরকারি স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্পগুলির পরিধি বাড়ালেও; দীর্ঘমেয়াদী হোম-কেয়ার ও অ্যাসিস্টেড লিভিং (Assisted Living) এর সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত অভাব রয়ে গেছে। স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রবীণদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপযোগী করে টেকসই হেলথকেয়ার স্টার্ট-সাহসের স্বীকৃতি আপ ও নার্সিং ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত; প্রবীণদের সামাজিক ও আর্থিক পুনর্বাসন। আমাদের সামাজিক মানসিকতায় ধরে নেওয়া হয় ৬০ বছর পার হলেই মানুষের কর্মক্ষমতা শেষ। কিন্তু উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা ও সচেতনতার ফলে আধুনিক প্রবীণদের একটি বিরাট অংশ ৬০ বছর অতিক্রম করার পরও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সক্ষম ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকেন। এদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে ‘অ্যাক্টিভ এজিং’(Active Aging) ধারণা বাস্তবায়ন করা জরুরী। সরকার সম্প্রতি SACRED ( Senior Able Citizens for Re – Employment in Dignity)- এর মতো পোর্টাল চালু করলেও এর ব্যাপ্তি অত্যন্ত সীমিত। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র থেকে শুরু করে এনজিও বা পরামর্শদাতা সংস্থাগুলিতে প্রবীনদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করলে তারা অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভর থাকতে পারবেন।
তৃতীয়ত; প্রবীণ -বান্ধব নগর পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি। ভারতের শহর ও পাবলিক ট্রান্সপোর্ট পরিকাঠামো মূলত তরুণ ও সক্ষম মানুষের কথা মাথায় রেখে তৈরি। হুইলচেয়ার -বান্ধব রাস্তা, প্রবীণদের উপযোগী গণপরিবহন এবং লিফট যুক্ত আবাসন এখনো বিরল। পাশাপাশি; ডিজিটাল অর্থনীতির এই যুগে ইউপিআই(UPI) ;অনলাইন ব্যাংকিং বা জরুরি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রবীণরা প্রায়ই ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ বা প্রযুক্তিগত বৈষম্যের শিকার হন। ফিনটেক সংস্থা এবং হোম- অটোমেশন প্রযুক্তিকে এমনভাবে ডিজাইন করা প্রয়োজন যা প্রবীনদের ব্যবহার বান্ধব ও নিরাপদ হবে।
তাহলে বার্ধক্য সুরক্ষায় রাষ্ট্রের সঠিক প্রস্তুতি কি হওয়া উচিত? প্রথমত; একটি ইউনিভার্সেল সামাজিক নিরাপত্তা ও পেনশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। অসংগঠিত খাতের প্রবীণ শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মানসম্পন্ন সামাজিক পেনশন নিশ্চিত না করলে দারিদ্র্য ও বার্ধক্যের মেলবন্ধন ভয়াবহ সামাজিক বৈষম্য তৈরি করবে। দ্বিতীয়ত; প্রবীণদের সঞ্চিত অর্থের নিরাপত্তা ও উচ্চ সুদের সুযোগ প্রদান করা; যাতে মুদ্রাস্ফীতি তাদের জীবনযাত্রার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে। তৃতীয়ত; পরিবার ভিত্তিক যত্নের সামাজিক মূল্যকে ধরে রেখেও পেশাদার কেয়ারগিভার ও ওল্ড -এজ হোম বা আবাসন ব্যবস্থার ওপর কঠোর সরকারি নজরদারি ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষা ও সিলভার ইকোনমির প্রস্তুতি কেবল মানবিকতার দিক থেকে নয়; দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রগতির স্বার্থেই অপরিহার্য। প্রবীণরা করুণা বা দয়ার পাত্র নন; তারা সমাজের অমূল্য অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বাহক। তরুণ দেশের খেতাব উদযাপনের পাশাপাশি যে সমাজ তার জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সম্মানজনক; নিরাপদ ও সাবলম্বী জীবন দিতে পারে; সেই সমাজই প্রকৃতপক্ষে উন্নত ও পরিণত। ভারতের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে কেবল ‘তরুণদের দেশ’ না থেকে সব বয়সের মানুষের জন্য এক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহানুভূতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা।