এশিয়ান গেমসের মঞ্চে সোনার মেয়েরা

Photo: X

এশিয়ান গেমসের মঞ্চে ভারতের প্রথম সোনা এল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের হাত ধরে। ২২ সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কাকে ১৪৭ রানে হারিয়ে পরপর দ্বিতীয়বার এশিয়ান গেমসে সোনা জিতল ভারত। ২০ ওভারে ভারত তুলেছিল ২১৬ রান, জবাবে শ্রীলঙ্কা ১৫.৪ ওভারে ৬৯ রানেই অলআউট হয়ে যায়।

স্কোরবোর্ডে এই বিশাল ব্যবধান নিঃসন্দেহে একটি বড় ক্রিকেট-সাফল্যের কথা বলে। কিন্তু এই জয়ের তাৎপর্য শুধু রান, উইকেট কিংবা পদকের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই সোনা ভারতীয় মেয়েদের ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা ও সম্ভাবনারও একটি উজ্জ্বল প্রতীক।
ফাইনালে স্মৃতি মন্ধানার ৭৯ রান, শেফালি বর্মার ৪৮ এবং শেষ দিকে রিচা ঘোষের মাত্র ২২ বলে অপরাজিত ৪৯ রানের বিধ্বংসী ইনিংস ভারতকে ২১৬ রানের বিশাল সংগ্রহ এনে দেয়। পরে ভারতীয় বোলারদের সম্মিলিত আক্রমণে শ্রীলঙ্কার ইনিংস থেমে যায় ৬৯ রানে।

এই সাফল্যের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বাংলার মেয়ে রিচা ঘোষের ভূমিকা। তাঁর ব্যাট থেকে শেষ মুহূর্তে যে ঝড় উঠেছিল, তা শুধু ভারতকে বড় রান এনে দেয়নি, দর্শকদেরও বুঝিয়ে দিয়েছে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট কতটা বদলে গেছে। এক সময় যে মহিলা ক্রিকেটকে ক্রিকেটের মূল স্রোতের বাইরে রাখা হত, আজ সেই দলের খেলোয়াড়রাই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্য ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দিচ্ছেন।


স্মৃতি মন্ধানার এই ম্যাচের আর একটি তাৎপর্য রয়েছে। ৭৯ রানের ইনিংসের পথে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১১ হাজার রানের মাইলফলক অতিক্রম করেছেন— একটি অসাধারণ ব্যক্তিগত কৃতিত্ব। শেফালি, রিচা, স্মৃতি, দীপ্তি, হরমনপ্রীত— এই প্রজন্মের খেলোয়াড়রা প্রমাণ করছেন, সুযোগ পেলে ভারতীয় মেয়েরা কোনও ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকেন না।

তবে এই সাফল্যকে কেবল কয়েকজন তারকা ক্রিকেটারের কৃতিত্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পিছনে রয়েছে বহু বছরের পরিবর্তন— মেয়েদের ক্রিকেটে পরিকাঠামোর উন্নতি, প্রশিক্ষণের সুযোগ, পরিবার ও সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজেদের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়ার সাহস। আজ দেশের ছোট শহর, মফস্বল, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিশোরীরাও ক্রিকেট ব্যাট হাতে মাঠে নামছে। তাদের সামনে এখন সফল মহিলা ক্রিকেটারদের বাস্তব উদাহরণ রয়েছে।

একটি মেয়ের হাতে যখন ব্যাট ওঠে, তখন তার সঙ্গে মাঠে নামে আরও অনেক মেয়ের স্বপ্ন। রিচা ঘোষের সাফল্য তাই বাংলার বহু কিশোরীর কাছেও বিশেষ অনুপ্রেরণার। কলকাতা বা বড় শহরের বাইরে থেকেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ মঞ্চে পৌঁছনো সম্ভব— রিচার সাফল্য সেই বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করে। খেলার জগতে মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু পদক জয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আত্মনির্ভরতা, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নিজের পরিচয় নিজে তৈরি করার সুযোগ। একটি মেয়ে যখন মাঠে দাঁড়িয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে, তখন সে শুধু একটি ম্যাচ খেলে না; সে সমাজের প্রচলিত বহু ধারণাকেও বদলে দেয়।

তাই এই সোনার পদককে অভিনন্দনের সঙ্গে একটি প্রত্যাশার সূচনা হিসেবেও দেখতে হবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরও বেশি ক্রীড়া পরিকাঠামো গড়ে উঠুক। মেয়েদের জন্য প্রশিক্ষণ, নিরাপদ মাঠ, দক্ষ কোচ এবং প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়ুক। পরিবার যেন মেয়ের খেলাধুলাকে সময় নষ্ট বলে না দেখে, বরং তার প্রতিভা ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দেয়।

আর আমাদের সমাজেরও দায়িত্ব আছে। মেয়েরা জিতলে হাততালি দেওয়া যথেষ্ট নয়, তাদের লড়াইয়ের পথটিও সহজ করে দিতে হবে। খেলাধুলায় যেমন, তেমনই শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, প্রশাসন, প্রযুক্তি কিংবা অন্য যে কোনও ক্ষেত্রে মেয়েদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

এশিয়ান গেমসের সোনার মেয়েরা তাই শুধু একটি ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরছেন না। তাঁরা সঙ্গে নিয়ে ফিরছেন এক নতুন প্রত্যয়ের বার্তা— ভারতের মেয়েরা পারে, এবং সুযোগ পেলে আরও অনেক দূর যেতে পারে।

সোনার পদকটি তাঁদের। কিন্তু তার আলো ছড়িয়ে পড়ুক দেশের প্রতিটি কিশোরীর চোখে। মাঠে, শিক্ষাঙ্গনে, কর্মক্ষেত্রে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মেয়েরা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে আসুক। এই সোনা হয়ে উঠুক আরও হাজার সোনালি স্বপ্নের শুরু।