ভারতের বিদ্যুৎ-ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে সম্প্রতি। চলতি বছরের জুলাইয়ের এক গরম দুপুরে অল্প সময়ের জন্য দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি পূরণ করেছে সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ ও পারমাণবিক শক্তি মিলিয়ে অ-জীবাশ্ম জ্বালানির উৎসগুলি। এক বছর আগেও প্রায় একই সময়ে এমন ঘটনা ঘটেছিল। অর্থাৎ এটি আর একেবারে বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। ভারতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় পরিচ্ছন্ন শক্তির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের এটি একটি স্পষ্ট সংকেত।
এক দশক আগেও ভারতের নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ছিল সামান্য। আজ সেই ক্ষমতা বেড়ে প্রায় ৩০০ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে। দেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৫৫২ গিগাওয়াট, তার মধ্যে ৫৪ শতাংশই এখন অ-জীবাশ্ম উৎসের। ২০৩০ সালের লক্ষ্যের পথে এটি নিঃসন্দেহে বড় অগ্রগতি। যে দেশ একসময় কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিল, সেই ভারত গত দশকে পরিচ্ছন্ন শক্তির ক্ষেত্রে যে দ্রুত পরিবর্তন ঘটিয়েছে, তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে এই সাফল্যকে দেখে আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়ানো এবং সেই বিদ্যুৎকে নির্ভরযোগ্যভাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহর ও শিল্পাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া— দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ভারতের বর্তমান সমস্যার বড় অংশ এখানেই।
সৌর ও বায়ুশক্তির প্রকল্প তৈরি হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। কিন্তু সেই তুলনায় বিদ্যুৎ পরিবহনের পরিকাঠামো বা গ্রিড তৈরি হচ্ছে ধীর গতিতে। ফলে কোথাও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা তৈরি হয়ে গেলেও তা সব সময় জাতীয় গ্রিডে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। গবেষণা সংস্থা এমবারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিনমাসে ভারতে নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিতে হওয়ার প্রধান কারণগুলির মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ছিল পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।
অর্থাৎ সূর্যের আলো থেকে কিংবা বাতাসের শক্তি থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে, তার একটি অংশ ব্যবহারই করা যাচ্ছে না। এটি অর্থনৈতিক ক্ষতি যেমন, তেমনই পরিবেশগত দিক থেকেও হতাশাজনক। কারণ একদিকে নতুন সৌর ও বায়ু প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রিডের অভাবে সেই উৎপাদন পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
সমস্যাটি আরও প্রকট হয়েছে গুজরাত ও রাজস্থানে নবীকরণযোগ্য শক্তির প্রকল্পের ব্যাপক কেন্দ্রীভবনের কারণে। এই দুই রাজ্যে প্রচুর রোদ ও বিস্তীর্ণ জমি থাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের কেন্দ্র এবং বিদ্যুতের প্রধান ব্যবহারক্ষেত্র সব সময় একই জায়গায় নয়। ফলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্য রাজ্যে পৌঁছে দিতে শক্তিশালী আন্তঃরাজ্য সঞ্চালন ব্যবস্থা দরকার। সেই পরিকাঠামো সময়মতো তৈরি না হলে উৎপাদন বাড়িয়ে লাভ কী?
এখানে পরিকল্পনার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্প তৈরি করতে যেখানে ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগতে পারে, সেখানে বিদ্যুৎ পরিবহনের পরিকাঠামো গড়তে অনেক বেশি সময় লাগে। জমি অধিগ্রহণ, বিভিন্ন দফতরের অনুমোদন, ‘রাইট অব ওয়ে’, রাজ্য ও কেন্দ্রের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়— সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হয়। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহনের পরিকল্পনাকে পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া জরুরি।
আর একটি বড় প্রশ্ন হল বিদ্যুৎ সংরক্ষণ। সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে দিনের বেলা উৎপাদন বেশি হলেও সন্ধ্যার পর সূর্যের আলো থাকে না। অথচ সেই সময়ই সাধারণত বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। ফলে দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সঞ্চয় করে সন্ধ্যার সময় ব্যবহার করা গেলে গ্রিডের উপর চাপ কমানো সম্ভব। কিন্তু ভারতে বৃহৎ আকারের ব্যাটারি-ভিত্তিক শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত দ্রুততার সঙ্গে গড়ে ওঠেনি।
এর পেছনে অর্থের সমস্যাও রয়েছে। ব্যাটারির দাম, কাঁচামালের জোগান, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং টাকার বিনিময়মূল্যের ওঠানামা— সবকিছুই এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে পরিকল্পিত অনেক সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে শুধু ব্যাটারি নয়, গোটা নবীকরণযোগ্য শক্তি খাতের জন্যই অর্থের জোগান একটি বড় বিষয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট অ-জীবাশ্ম বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে পৌঁছতে ভারতের বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, প্রয়োজন হতে পারে ৪০০ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। ভারতের জলবায়ু-সংক্রান্ত বিনিয়োগের বড় অংশ এখনও দেশীয় উৎস থেকেই আসে। আন্তর্জাতিক অর্থের প্রবাহ সেই তুলনায় যথেষ্ট নয়।
এখানে উন্নত দেশগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল উন্নয়নশীল দেশগুলির দায় নয়। উন্নত দেশগুলি যদি কম সুদের ঋণ, ঋণের গ্যারান্টি এবং মুদ্রার বিনিময়জনিত ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা করে, তাহলে ভারতের মতো দেশের পরিচ্ছন্ন শক্তি প্রকল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তাই নতুন করে সামনে আসছে।
ভারতের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বিদ্যুতের দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদার কারণে। শিল্পায়ন, নগরায়ন, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ডেটা সেন্টার এবং সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের মতো নতুন ক্ষেত্র আগামী দিনে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়াবে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়তে পারে।
তাই ভারতের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ— একদিকে বাড়তি বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো, অন্যদিকে সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কার্বন নিঃসরণ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। কয়লা এখনও ভারতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি। কারণ সৌর ও বায়ুশক্তির মতো উৎসের উৎপাদন সব সময় একই মাত্রায় থাকে না। কিন্তু নবীকরণযোগ্য শক্তির ক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার চরিত্র যে বদলাচ্ছে, তার ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।
ভারতের সবুজ শক্তির যাত্রা তাই নিছক পরিবেশ রক্ষার প্রকল্প নয়; এটি অর্থনীতি, শিল্প, প্রযুক্তি এবং শক্তি-নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত। আগামী দিনের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কত গিগাওয়াট নতুন সৌর বা বায়ু প্রকল্প তৈরি হল তার উপর নয়। একই সঙ্গে কত দ্রুত গ্রিড সম্প্রসারিত হল, কতটা বিদ্যুৎ সঞ্চয় করা গেল এবং বিনিয়োগের জন্য কতটা সস্তা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থ পাওয়া গেল— সেই প্রশ্নগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পরিচ্ছন্ন শক্তির পথে ভারত ইতিমধ্যেই অনেকটা এগিয়েছে। কিন্তু এখন আসল পরীক্ষা হল সেই গতি ধরে রাখা এবং উৎপাদন, পরিবহণ ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। ভারতের এই রূপান্তর সফল হলে তার প্রভাব শুধু দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলাতেও তার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে।