এশিয়ান গেমসে ভারতের মহিলা খেলোয়াড়দের সাফল্য নিছক কয়েকটি সোনার পদক জয়ের ঘটনা নয়। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান, আত্মবিশ্বাসের উত্থান এবং ভারতীয় মহিলা ক্রীড়ার ক্রমবর্ধমান শক্তির এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। এক দিনে ভারতের ঝুলিতে ছ’টি সোনা এসেছে, যার বড় অংশই এসেছে মহিলা খেলোয়াড়দের হাত ধরে। ৪৪ বছর পর মহিলা হকিতে সোনা জয় সেই সাফল্যের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়।
১৯৮২ সালে এশিয়ান গেমসে প্রথম বার মহিলা হকিতে সোনা জিতেছিল ভারত। তারপর কেটে গিয়েছে চার দশকেরও বেশি সময়। মাঝের এই দীর্ঘ সময়ে ভারতীয় মহিলা হকি দল বহুবার প্রত্যাশা জাগিয়েছে, কিন্তু সোনার পদক অধরাই থেকেছে। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল চিনকে ১-০ গোলে হারিয়ে। লালরেমসিয়ামির গোল এবং সবিতা পুনিয়ার অসাধারণ গোলরক্ষা শুধু একটি ম্যাচ জেতায়নি, বরং একটি দীর্ঘ ইতিহাসের অসমাপ্ত অধ্যায়কে পূর্ণ করেছে। বিশেষ তাৎপর্যের বিষয়, নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে লালরেমসিয়ামির গোলেই এল সেই ঐতিহাসিক জয়।
এই জয়ের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় প্রতিপক্ষের শক্তির কথা বিবেচনা করলে। চিনের মহিলা হকি দল আন্তর্জাতিক স্তরে যথেষ্ট শক্তিশালী। ম্যাচের বড় অংশে ভারতকে রক্ষণ সামলাতে হয়েছে। কিন্তু চাপের মধ্যেও ভারতীয় খেলোয়াড়েরা যে সংযম, শৃঙ্খলা ও মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন, তা সাফল্যের অন্যতম কারণ। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোল অক্ষত রেখে সোনা নিশ্চিত করা দেখিয়ে দিল, বড় ম্যাচে শুধু আক্রমণ নয়, সংগঠিত রক্ষণও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অন্যতম শর্ত।
তবে দিনের সাফল্য হকিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বক্সিংয়ে লাভলীনা বরগোঁহাই, পারভিন হুডা এবং অন্যান্য ভারতীয় বক্সারদের সাফল্য মহিলা ক্রীড়ার বিস্তৃত পরিসরের পরিচয় বহন করে। বিশেষ করে জন্মদিনে লাভলীনার সোনা পাওয়া নিঃসন্দেহে স্মরণীয়। আগের এশিয়ান গেমসে রুপো জেতার পর এবার সোনায় উন্নীত হওয়া তাঁর ব্যক্তিগত অগ্রগতিরও প্রমাণ।
তিরন্দাজিতেও ভারতীয় মহিলা দল অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। রিকার্ভ দলগত ইভেন্টে অঙ্কিতা ভকত, কীর্তি ও কুমকুম মোহদের সোনা দেখিয়েছে, চাপের মুহূর্তে ভারতীয় খেলোয়াড়েরা কতটা স্থির থাকতে পারেন। ফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয় পাওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
এই সাফল্যের পিছনে তাই শুধু প্রতিভা নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতারও ভূমিকা রয়েছে। ভারতীয় মহিলা খেলোয়াড়েরা এখন আর কেবল অংশগ্রহণকারী নন, তাঁরা বিশ্বমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছেন।
তবে পদকের আনন্দের পাশাপাশি একটি বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে রাখা জরুরি— এই সাফল্যকে কীভাবে ধারাবাহিক করা যাবে? কয়েকটি বড় প্রতিযোগিতায় সাফল্যের পরই যেন মনোযোগ থেমে না যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিভা খুঁজে বের করা, প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো, আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞান ও পুষ্টিব্যবস্থার উন্নতি এবং মহিলা খেলোয়াড়দের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
এশিয়ান গেমসের এই সোনালি দিন তাই কেবল উদ্যাপনের নয়, ভবিষ্যতের দায়িত্ব মনে করিয়ে দেওয়ারও দিন। ভারতের মেয়েরা ইতিমধ্যেই পথ দেখিয়েছেন। এখন তাঁদের সাফল্যকে স্থায়ী শক্তিতে পরিণত করার দায়িত্ব ক্রীড়া প্রশাসন, প্রশিক্ষক এবং সমাজের।